মেয়াদউত্তীর্ণ তিস্তা রেলসেতু দিয়ে আজও চলছে ৩৯টি ট্রেন

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৮, ১৩:৪৫
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা সীমােন্ত তিস্তা নদীর ওপর বৃটিশ আমলে নির্মিত রেলসেতুর আয়ুষ্কাল প্রায় ৮৪ বছর আগে শেষ হয়ে গেলেও রেল বিভাগ সংস্কারের মাধ্যমে চালােচ্ছ রেল গাড়ি। লালমনিরহাট রেল ডিভিশনের ১২টি রুটে রংপুরসহ সারাদেশের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী মেয়াদোত্তীর্ণ এই রেলসেতুর ওপর দিয়ে আজও চলছে ৩৯টি ট্রেন। 
 
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল লালমনিরহাট ডিভিশন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুশ’ বছর আগে অবিভক্ত বাংলার এক প্রান্ত আলাদা করে রেখেছিল প্রমত্তাতিস্তা নদী। সে সময় তিস্তা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ সম্ভব ছিল না। নদী পারাপারের জন্য বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত ফেরির ব্যবস্থা ছিল। এরপর কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের যোগাযোগ সহজ করতে রেলওয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ১৮৩৪ সালে ২১১০ ফুট লম্বা রেলসেতুটি নির্মাণ করে। আর সেতুটির নামকরণ করা হয় তিস্তা রেলসেতু। তখন ছিল দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রেলসেতু হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন সেতুটি কেবলমাত্র রেল চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়।
 
এরপর সারাদেশের সাথে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য বিকল্প সড়ক সেতু নির্মাণ করার দাবি ওঠে। পরে ১৯৭৭ সালে রেলওয়ে ও সওজ বিভাগ যৌথভাবে রেলসেতুতে মিটারগেজ লাইনের পাশে ২৬০টি স্টিলের টাইফ পেন্টেট ও কাঠের পাটাতন স্থাপন করে। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে রেলওয়ের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ উন্মুক্ত করেন। সে থেকেই তিস্তা রেল সেতু দিয়ে ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করতো। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক পারাপারের ফলে সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আর এটি একমুখী সেতু হওয়ায় উভয় পাশে একই সঙ্গে যানবাহন চলাচল করতে পারে না। যখন ট্রেন আসে তখন সেতুতে যানচলাচল বন্ধ থাকে। ফলে একমুখী সেতু পারাপারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় যাত্রী সাধারণকে আর পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। এরপরও প্রায় পৌনে দুইশ’ বছর পার হওয়া তিস্তা রেলওয়ে সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনই দুর্ঘটনাকে সঙ্গী করে ওই দু’জেলার বাসিন্দারা কষ্টেশিষ্টে চলাফেরা করে।
 
 অনিবার্য বাস্তবতায় রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার অর্ধকোটি মানুষ তিস্তা নদীর উপর সড়ক সেতু নির্মাণের দাবি জানান। দাবির প্রেক্ষিতে রেলসেতুর উত্তর প্রান্তে প্রায় তিনশ’ মিটার দূরত্বে ২০০১ সালে তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আবারও নতুন করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু সরকারের পালাবদল ও ১/১১ সরকারের আমলে আবারও থমকে যায় সড়ক সেতুর নির্মাণ কাজ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সরকার গঠন করার পর ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে বতর্মান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু উদ্বোধনের পর তা যান চলাচলের জন্য উন্মোচন করা হয়। আর সড়ক সেতু চালু হওয়ার পর মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতুর ওপর দিয়ে আজও চলছে ট্রেন যোগাযোগ।  
 
কাউনিয়া রেলওয়ে স্টেশন কর্মকর্তা (মাস্টার) বাবু আল রশিদ জানান, ১৯৩৪ সালের দিকে রেলসেতুটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুটির ওপর দিয়ে কুড়িগ্রাম  ও লালমনিরহাট স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা দৈনদিন ঢাকাগামী লালমনিরহাট এক্সপ্রেসসহ ৩৯টি ট্রেন চলাচল করছে। রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল লালমনিরহাট ডিভিশনের বিভাগীয় প্রকৌশলী  জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ কি না আমাদের কাছে এর কোন তথ্য নেই। তবে ২০১২ সালের আগে রেলসেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। সড়ক সেতু চালু হওয়ায় পর এবং সেতুটি সংস্কার করায় এখন ঝুঁকিমুক্ত বলে তিনি মনে করেন।
 
ইত্তেফাক/এমআই