খায়রুল বাবুই
নারীর নাম—সানোয়ারা। গত দুপুর থেইকা আমার বউ। ১১ হাজার ৪৫০ টাকা বেতনে চাকরি কইরা আমি যে বীরত্বের পরিচয় দিছি—সেইডারে কেউ কেউ ছাগলামি ভাবতেছে। ভাবুক। হেরা ভাবতে ভাবতেই তো আমি বাসর রাত পার কইরা দিলাম। সানোয়ারার লগে জড়াজড়ি কইরা শুইয়া থাকলাম। বাসর রাতে আরো যা যা হয়—সবই করলাম। স্বপ্নে বালু আর সবুজ ঘাসও খাইলাম
মিনহাজ কনফিডেন্টলি কইল, ভাই, আপনি এখনো ঘাস খাওয়া শুরু করতেছেন না ক্যান?
অফিস-কলিগ মিনহাজের ফালতু কথারে আমি পাত্তা দিলাম। জরুরি ভিত্তিতে আড্ডা থেইকা উইঠা খাড়াইলাম। দিলাম দৌড়। দৌড়াইতে দৌড়াইতে হাঁপায়া উইঠা যেইখানে আইসা পৌঁছাইলাম, চারদিকে দেখি—বিরান মাঠ। ধু-ধু। সবুজ নাই। শুধু বালু আর বালু। ঘাস নাই। মাথার ওপর গনগনা সূর্য। চকচকা রইদ। পুরা শরীর ঘামে জবজব। হলুদ রঙের শার্ট ভিইজা একসা। আমি হাঁটু গাইড়া বসলাম। একমুঠ বালু নিয়া মুখে পুইরা দিলাম। কচকচ। কড়কড়। কচকচ...।
চাবাইতে চাবাইতে মনে হইল, সাত সেকেন্ডের মধ্যে যদি এক চুমুক পানি না জোটে, মইরা ছাগল হইয়া যামু। গলায় রশি বাইন্ধা মহাজন আমারে হাঁটে নিয়া যাইবে বিক্রি করার লাইগা। জোর কইরা চোয়ালের ফাঁক দিয়া দাঁত দেইখা, পাছায় থাপ্পড় মাইরা কেউ একজন আমারে ১১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিইনা নিয়া যাইব। তারপর ওয়ান ফাইন মর্নিং—কাচ্চি খাওনের খায়েশ পূরণের লাইগা আমার সামনে ইয়া বড় একখান ছুরি লইয়া খাড়াইব। আমি ‘মরিতে চাহি না এই সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই’ বলিতে গিয়া ‘ম্যা-ম্যা-ম্যাএএএএ’ কইরা চিত্কার দিয়া উঠুম। সেই চিত্কারে ছুরির ধার কইমা যাইব। কাচ্চি-খানেওয়ালাদের দিলে রহম হইব। আমার গলার রশি খুইলা দিবে তারা। এক দৌড়ে আমি আবার সেই মাঠে চইলা আসব। আইসা দেখব বালু নাই। সবুজ ঘাস। আমি কচকচ কইরা ঘাস চাবাইতে শুরু করব—ঠিক তখনই ‘আরে আরে... করে কী...’ বলতে বলতে পাশে শুয়ে থাকা এই গ্রহের অন্যতম সেরা সুন্দরী নারীটি তার সবুজ শাড়িখান আমার হাত এবং দাঁতের কবল হইতে উদ্ধার কইরা নেয়।
নারীর নাম—সানোয়ারা। গত দুপুর থেইকা আমার বউ। ১১ হাজার ৪৫০ টাকা বেতনে চাকরি কইরা আমি যে বীরত্বের পরিচয় দিছি—সেইডারে কেউ কেউ ছাগলামি ভাবতেছে। ভাবুক। হেরা ভাবতে ভাবতেই তো আমি বাসর রাত পার কইরা দিলাম। সানোয়ারার লগে জড়াজড়ি কইরা শুইয়া থাকলাম। বাসর রাতে আরো যা যা হয়—সবই করলাম। স্বপ্নে বালু আর সবুজ ঘাসও খাইলাম। যারা আমারে ছাগল ভাবতেছে, বিশেষ কইরা আমার অফিসের কিছু সিনিয়র কলিগ, যারা ‘ইস! সানোয়ারারে যদি বিয়া করতে পারতাম’ টাইপের বদমাশ, তাদের আমি দেখায়া দিছি—ছাগলে কী না খায়!
২.
আমার অফিসের বস একটা খাটাশ।
কথায় কথায় নাকের ভেতর আঙুল দিয়া পশম টানে। প্রথম প্রথম তার এমন খাসটামি মুগ্ধ হইয়া দেখার ভান করতাম।
খাটাশটা আমারে কইতো, ‘বয়স কত তোমার বেলাল?’
‘জি স্যার, সাড়ে চব্বিশ।’
‘উ-উক...’ কইরা শব্দ হইল। খাটাশটা নাকের একটা পশম ছিঁড়ছে।
‘শোন মিয়া, চব্বিশ বছর বয়সে আমি বেকার ছিলাম। একলগে তিনটা মাইয়ার পিছে ঘুরতাম। এর মধ্যে একটার বুকে তিন দিন হাত দিছি। একটার ঠোঁটে চুমা খাইছি দশ-বারো বার। হা হা হা...’
‘আর বাকিডারে?’ ক্যান জানি আমার মুখ দিয়া প্রশ্নডা বাইর হইয়া গেল।
খাটাশটা আবার নাকের ভিতর আঙুল ঢুকাইছে। আমি চোখ সরায়া নিলাম।
‘যেইডা কিছু করতে দেয় নাই, হেইডারেই তো বিয়া করছিলাম। বুঝলা? হা হা হা...।’
বসের হাসিটাও খাটাশের মতো। আমি কিছু না বুইঝাই মাথা নাড়াই, ‘ও...।’
বস কয়, ‘শোনো, তুমি চব্বিশ বছর বয়সেই চাকরি পাইছো। যৌবন খুব খারাপ জিনিস। কনট্রোল করা টাফ! বাসায় কও তোমারে যেন বিয়া করায়া দেয়।’
‘১১ হাজার সামথিং টাকায় বিয়া করুম স্যার! কোন বাপ আমার কাছে তার মাইয়া দিব? কোন মাইয়া আমার কাছে বিয়া বইব?’
বস সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি চোখ নামায়া নিমু কি না ভাবনের আগেই ফিসফিস কইরা কইল, ‘শোন মিয়া, তুমি হ্যান্ডসাম আছো। বুকে সাহস রাখো। মেয়ে বা মেয়ের বাপ—কাউরেই পাত্তা দিবা না। পছন্দ হইলে বুদ্ধি খাটায়া কাম সাইরা ফেলবা। টাকা কামাইতে বেশি সময় লাগে না, বুঝলা?’
আমি বুঝলাম। শালার বসের ব্যবসার মইধ্যে যে দুই নম্বরি আছে—সেইটাও বুঝি। বুকে বল পাইলাম। আস্তে কইরা ‘আইচ্ছা স্যার’ বইলা রুম থেইকা বাইর হইয়া আসি। এর তিন মাস পরই বিয়া করি আমি, কনের নাম সানোয়ারা মোরশেদ—খাটাশ ওরফে আমার বসের একমাত্র মাইয়া।
৩.
সেইদিন বসের কথা শুইন্যা আমার মগজে জট লাইগা গেছিল। হালায় কী বুদ্ধি দিল এইডা! সাড়ে আট বছর থেইকাই এতিম আমি। মা-বাপ একলগে গেছে। বাস অ্যাকসিডেন্টে। বড়কাকা আমারে শেষবারের মতো বাপ-মা’র চেহারাডা পর্যন্ত দেখতে দেয় নাই। বাচ্চা পোলা, দেখলে নাকি ভয় পামু—এই অজুহাতে। জন্ম থেইকাই যে দুইটা মুখ দেইখা সাড়ে আট বছর পার করছি, সেই মুখগুলা যেমনই হোক—আমার জন্য যে মোটেও ভয়ের কারণ হইতে পারে না, সেইটা তখন আমি নিজেও বুঝি নাই, কাউরে বুঝাইতেও পারি নাই। বড়কাকাই বাধ্য হইয়া কিছুটা যত্নে-আদরে, বেশিরভাগ সময়ই পিটায়া-পাটায়া আমারে মানুষ করার চেষ্টা করছে। এর আগে ছাগলই আছিলাম! এতিম হওনের পর আমি কথা বলা কমায়া দিই। স্কুলে টিচাররা প্রশ্ন করলে, উত্তর জানার পরও চুপ থাকি। ফাঁকিবাজ পোলা, উচ্ছন্নে গেছে—এইরকম অপবাদ হজম করি। ভাইভা পরীক্ষায়ও চুপ থাকনের ‘অপরাধে’ কোনোমতে টাইনা-টুইনা পাস করি। ম্যাট্রিক। ইন্টার। বিএ পাস করার ব্যাপারে বড়কাকার আগ্রহ বা ইচ্ছা—কোনোটাই ছিল না। আমি অবশ্য ম্যাট্রিকই পাস করতে চাই নাই। বড়কাকা তার বিশাল কাপড়ের দোকানে যেদিন বসার লাইগা জোরাজুরি করছিল, সেই দিনই আমি এক কাপড়ে ঢাকায় চইলা আসি। তারপর কোনোদিন আর নেয়ামতপুরে, কয়রা বা খুলনায় যাই নাই। তখন আমার উনিশ। কী আশ্চর্য! বড়কাকা, যিনি এতিম আমারে বুকে টাইনা নিলেন; বড়কাকি, যিনি আদর কইরা মুখে ভাত তুইলা খাওয়াইছেন অনেকদিন; চাচাতো বোন শায়লা, যার লগে আমার বিয়া দেওনের চিন্তা করতেছিলেন বড়কাকা-কাকি; তাদের কারো জন্যই গত পাঁচ বছরে আমার পরান পুড়ে নাই। ঢাকায় আসনের পর একদিনও ফোন কইরা ‘ক্যামন আছেন কাকা?’ জানতে চাইবার ইচ্ছা হয় নাই। আমি এমন পাষাণ আর অকৃতজ্ঞ ক্যান হইছি—নিজেও বুঝতে পারি না।
৪.
সানোয়ারার লগে বছর দুয়েক সংসার-নামক সার্কাস করার পর আমি বুইঝা ফেললাম, খাটাশের ঘরে একটা মায়াহরিণ জন্মাইছে।
শ্বশুর-আব্বার দেওয়া ফ্ল্যাটে থাকি। ঘুমাই। সানোয়ারারে আদর করি। ওরে নিয়া বসের টাকায় বিদেশ-ভ্রমণ করি। এর মধ্যে সানোয়ারাও পোয়াতি হইল।
জুনিয়র এক্সিকিউটিভের ডেস্ক থেইকা এখন আমি চিফ এক্সিকিউটিভের বিশাল রুমে বসি। আমার যোগ্যতা নিয়া অফিসের ছিয়াত্তরজন কর্মীর কেউই কানাঘুষা করে না, তাইলে জানে, ওদের যোগ্যতা নিয়াই টানাটানি পড়বে। কারণ আমার সাইনে ওদের বেতন বাড়ে, প্রমোশন হয়।
এসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন মোরশেদ, মানে আমার ঘরে শ্বশুর, অফিসে বস—ক্যান যে আমারে মেয়ে-জামাই হিসাবে মাইনা নিলো, সেই হিসাব এসএম গ্রুপের মহা-হিসাবরক্ষকও বাইর করতে পারে নাই।
ঘটনার সারাংশ কয়েক লাইনে কওয়া দরকার।
পবন রহমান নামে এক স্মার্ট টাউটের লগে সানোয়ারার পিরিত ছিল। আরেকটা গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকের পোলা সে। সানোয়ারার ক্লাসমেট। বড়লোকের পোলাগো সুযোগ বেশি, ধৈর্য কম! মাস তিনেক প্রেম-প্রেম খেলার পর ধৈর্যে কুলায় নাই। পবন নাকি সানোয়ারারে ‘খাইয়া দিছে’। সানোয়ারা বিয়ের কথা তুলতেই পবন কইছে, বিয়ের আগেই যে মাইয়ারে বিছানায় পাই, তারে বিয়া করার দরকারটা কী?
সানোয়ারার বাপ এসবের কিছুই জানত না। গণিতে ভালো ছিলাম। বসের কথামতো অফিস বন্ধের দিন বাসায় গিয়া সানোয়ারারে জটিল সব অঙ্ক সহজে বুঝায়া দিতাম। কয়েক মাসের মধ্যে সানোয়ারা পুরোপুরি আমি-নির্ভর হইয়া পড়ে। বইলা দেয় তার জীবনের গোপন-করুণ ঘটনাটা।
সব শুইনা আমার মনে দয়া হয়। দয়াও যে এমনি-এমনি হইছে—ব্যাপারটা তেমন না। অনেকগুলো হিসাব মেলানোর পরই সিদ্ধান্ত নিছিলাম, এই দয়া দেখানোয় ফায়দা আছে।
একদিনের সিদ্ধান্তে আমি আর সানোয়ারা কাজি অফিসে গিয়া বিয়া করি। আমার মধ্যে দয়া আর ভালোবাসা ছাড়া কিছু নাই—এইটাই নাকি সানোয়ারারে সিদ্ধান্ত নিতে ঠ্যালা দিছে। অবশ্য আমার অন্তরের দয়াতত্ত্ব এবং বাইরের পুরুষত্ব—দুইটাই সানোয়ারার মন গলাইতে উনুনের কাজ করছে বইলা আমার বিশ্বাস।
আমারে সাহস জোগাইছিল বসের কওয়া সেই কথাগুলা—শোন মিয়া, তুমি হ্যান্ডসাম আছো। বুকে সাহস রাখো। মেয়ে বা মেয়ের বাপ—কাউরেই পাত্তা দিবা না। পছন্দ হইলে বুদ্ধি খাটায়া কাম সাইরা ফেলবা। টাকা কামাইতে বেশি সময় লাগে না, বুঝলা?
খাটাশ স্যরি বসের বুদ্ধিটা কাজে লাগাইতে পাইরা নিজেরে অসম্ভব জ্ঞানী আর সফল মনে করা শুরু করছি। ভাবতাছি ‘সফল হওয়ার কার্যকরী উপায়’ নামে একটা বই লিইখা ফেলব। আর এই বিষয়টা যখনই মনে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে সানোয়ারারে জড়ায়া ধইরা চটাস কইরা দুই গালে দুইখান চুমা খাই। তখন ‘তুমি যে একটা কী না...’ বলতে বলতে আমারে ধাক্কা দিয়া সরাইয়া দেওয়ার বৃথা চেষ্টাকারিনী সানোয়ারার ফরসা গাল হালকা লাল হইয়া যায়।
৫.
এরই মধ্যে আমি এসএম গ্রুপের ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যবসার ব্যাপারে এক্সপার্ট হইয়া গেছি। গোমর বুইঝা ফেলার কারণে কোমর শক্ত হইছে। গ্রুপের চেয়ারম্যান, মানে আমার শ্বশুর, একমাত্র মেয়ের মুখের দিকে তাকায়া আমারে মনে মনে গালি দিলেও মুখে কয়—বেলাল, তোমারে কিন্তু আমি প্রথম থেইকাই আলাদা ভাবছি। তুমিই পারবা আমার ব্যবসার হাল ধরতে। সানোয়ারারে এবং এসএম গ্রুপের দায়িত্ব তোমার হাতে তুইলা দিয়া আমি নিশ্চিন্ত!
শালার দুই নম্বর লোকের লগে এক নম্বরি দেখাইয়া লাভ নাই, সম্পর্কে সে শ্বশুরই হোক বা অন্য কেউ। সে যতদিন নিশ্চিন্ত থাকব—ততদিন তো আমি নিশ্চিন্ত না।
সানোয়ারার গর্ভে আমার ঔরসজাত সন্তান। আমার প্রথম জীবন যেভাবে গেছে, অনাগত সন্তানের জীবন আমি সেইভাবে যাইতে দিব না। সব প্ল্যান মোটামুটি ফাইনাল। মাত্র একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া বাকি।
কারণ, প্রমাণ পাইছি—শুধু শিয়ালের চতুরতা কাজে লাগাইয়া কেউ সিংহাসন দখল করতে পারে না, সিংহের মতো সাহসও লাগে!
