অভাবে সন্তান বিক্রি করা অসহায় পরিবারের সাথে টালবাহানা শুরু করেছে দালালরা। সন্তানের বদলে একটি ঘর করে দেওয়ার কথা। কিন্তু ২০ দিন পার হলেও নতুন ঘর করে দিচ্ছে না তারা। উল্টো ভোটার আইডি কার্ড, ছবি ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার জোড় তৎপরতায় পরিবারটি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার জোরবাড়ীয়া গ্রামের কাচারীর পশ্চিম পাশে প্রতিবন্ধী দুলাল মিয়ার বসবাস। দুলালের প্রথম স্ত্রী নাজমা খাতুন ৮ বছর আগে ইব্রাহিম মিয়া (২০) ও রানা হোসেন (২০) নামের দুই ছেলে রেখে মারা যান। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর পার্শ্ববর্তী গ্রামের রওশন আরাকে ৭ বছর আগে বিয়ে করেন শারীরিক দুলাল। তার দ্বিতীয় স্ত্রী রওশন আরার ঘরে শান্তা (৭), সিয়াম (৩), সানজিদা (২) সিফাত (দেড় বছর) নামের ৪টি শিশু সন্তান রয়েছে। ২৫ দিন আগে রওশন আরা আরও একটি ছেলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। ছেলে সন্তান জন্মের পর সন্তানটি অভাবের এ সংসারে লালন পালন করতে পারবে না ৬ দিনের দিন পার্শ্ববর্তী বাড়ি আব্দুর রউফ নামের ঢাকার যাত্রাবাড়ীর এক লোকের কাছে সন্তানটি দিয়ে দেন।
রওশন আরা জানান, আমাদের সংসারে অভাব। স্বামী পঙ্গু। আরও ৪টি শিশু সন্তান রয়েছে সংসারে। আব্দুর রউফ আমাদের একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে ৬ দিনের শিশুকে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর এক লোকের কাছে পালক হিসাবে দিয়েছে। আব্দুর রউফের ছেলে রকিব ওই লোকের বাসায় থেকে মাদরাসায় লেখাপাড়া করে বলে জানান রওশন।
চোখের জল মুছে রওশন বলেন, আমরা শুনেছি ছেলেটা নাকি ভাল আছে। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
দুলাল মিয়া প্রথমে সন্তান বিক্রির কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করে বলেন, থাকার মতো কোনো ঘর নেই, সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না। তাই নতুন একটি ঘর নির্মাণের করে দেওয়ার বিনিময়ে আব্দুর রউফের মাধ্যমে ৬ দিন বয়সের ছেলে সন্তানকে ঢাকায় একজন চাকরিজীবীকে দিয়ে দিয়েছি। এখন ঘর করে দিচ্ছে না। যে আমাদের সন্তান নিয়েছে তাকে আমার চিনি না। আমাদের ছবি, ভোটার আইডি কার্ড নিতে চাইছে ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলেন, আমরা করিনি।
বিষয়টি নিয়ে আব্দুর রউফ বলেন, দুলালের স্ত্রীর সন্তান হওয়ার আগে থেকে তারা তাদের সন্তানকে কোথাও পালক (দত্তক) দিয়ে দিতে বলেন। আমার ছেলে মাধ্যমে তাদের সন্তানকে দত্তকের ব্যবস্থা করি। ছেলে সন্তান হওয়ার পর তারা ছেলের বিনিময়ে প্রথমে এক লাখ টাকা পরবর্তী ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সন্তান দত্তক দিয়ে দেই। সন্তান যদি তারা ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে নিয়ে এসে তাদের বুঝিয়ে দিব।
কার কাছে সন্তান দত্তক দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তাদের চিনি না আমার ছেলের পরিচিত।
প্রতিবন্ধী দুলালের ভাই আব্দুল মজিদ জানান, ২০ হাজার টাকার ও নতুন করে একটি ঘর নির্মাণের কথা তিনি শুনছেন। আব্দুর রউফ বলেছে, টাকা নিলে ঘর দিবে না। এ কারনে তারা টাকায় নেয়নি। তবে পরিবারটির চিকিৎসার ও চাল কেনার জন্য রউফের কাছে ২০ হাজার দিয়ে গেছে বলেও জানান মজিদ।
মজিদ আরও জানান, শিশুটি নেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে দুজন মহিলা এসেছিল। আমি তাদেরকে চিনি না। পর দিন সকালে ভাই-ভাবীর কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙ্গার পর তিনি জানতে পারেন মহিলারা ৬ দিনের শিশুটি নিয়ে গেছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার সুরুজ আলী জানান, শিশু বিক্রির খবরটি তার জানা নেই। এমন হলে বিষয়টি দেখার দরকার।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লীরা তরফদার বলেন, নিজের সন্তান বিক্রি করা সমাজের জঘন্যতম কাজ। তাদের যদি ঘরের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে আমাকে জানালে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করে দিতাম। সন্তান বিক্রির বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ইত্তেফাক/বিএএফ
