আমদানি করা কেমিক্যাল বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদিত গোডাউনে মজুতের নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। পুরান ঢাকাসহ রাজধানীতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদিত গোডাউন রয়েছে ১৩৭টি। অথচ সেখানে কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ।
বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, ইসলামপুর ও চাঁনখারপুলসহ আশপাশের এলাকার আবাসিক ভবনে স্থাপন করা হয়েছে এসব গোডাউন। মার্কেট ও জনবহুল বিপণিবিতানেও স্থাপন করা হয়েছে গোডাউন। প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিচের বেজমেন্টে গোডাউন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতি দাহ্য পদার্থ ও কম দাহ্য পদার্থ।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর ৩১ ধরনের কেমিক্যালকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই কেমিক্যাল আমদানি ও মজুতের অনুমতি বিস্ফোরক অধিদপ্তর দিয়ে থাকে। এর জন্য গোডাউনের নকশা, আমদানির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ কমপক্ষে ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়।
বিস্ফোরক অ্যাক্ট-১৮৮৪ এবং সিলিন্ডার বিধিমালা-১৯৯১ তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠছে এসব অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন। অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই। বিস্ফোরক অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সামনেই কেমিক্যালগুলো গোডাউনে মজুত করা হচ্ছে। অনিরাপদ অবস্হায় এসব কেমিক্যাল গুদাম থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ঠেলাগাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। অভিযোগ আছে, কেমিক্যাল সংশ্লিষ্ট বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর কিছুদিন সিটি করপোরেশন আরো কয়েকটি সংস্থার সহায়তায় চালায় অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান। কিছুদিন পর অভিযান ঝিমিয়ে পড়ে। হাজার হাজার অবৈধ কেমিক্যালের দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্য করলেও সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার তো দূরের কথা, মামলা পর্যন্ত দায়ের হয় না।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রায় সবগুলোই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবহেলাজনিত কারণে হয়েছে। যার সূত্রপাত হয়েছিল অনিরাপদ ও অবৈধ গোডাউনে কেমিক্যাল মজুতের কারণে। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই কেমিক্যাল ব্যবসা করছেন। তারা চরম বিপজ্জনক কেমিক্যাল মজুত, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে আইনের বাধ্যবাধকতা মানছেন না।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল মোস্তফা বলেন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর অনুমোদিত ৩১ ধরনের কেমিক্যালের বাইরে আরো বহু ধরনের কেমিক্যাল আমদানি করা হয়। এসব কেমিক্যাল সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্সের বিপরীতে আমদানি ও মজুদ করা হয়। তবে গত ১০ বছর ধরে সিটি করপোরেশনের এই ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন স্থগিত রয়েছে। এসব কেমিক্যাল মজুত করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ‘কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’নির্মাণ করছে। সেটি চালু না হওয়া পর্যন্ত পুরান ঢাকায় শুধু বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। তবে এসব কেমিক্যালের মধ্যে শিল্প-কলকারখানায় ব্যবহৃত বিপজ্জনক ৩১ কেমিক্যাল নেই।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাসায়নিক ব্যবসার জন্য নতুন ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছে। সিটি করপোরেশন বলছে, ২০১৯ সালের পর আর কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। এমনকি আগের লাইসেন্সও নবায়ন করা হয়নি। কিন্তু কেমিক্যাল গোডাউনের ব্যবসা ঠিকই চলছে।
২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যাল গোডাউনের বিস্ফোরণে ১২৭ জন নিহত হয়। ঐ ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদের আন্দোলনে নামে এলাকাবাসী। কিছু সময়ের জন্য প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। পরে গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান থেমে যায়।
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণে ৭১ জন নিহত হন। ঐ ঘটনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদে অভিযান চালায়। মাত্র ৩৩ দিন অভিযান পরিচালনা করে ১৭০টি কেমিক্যাল গোডাউন সিলগালা করা হয়। এরপর অদৃশ্য কারণে সেই অভিযান থেমে যায়।
রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস আমদানির লাইসেন্স পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু বিস্ফোরক অধিদপ্তর যাদের স্টোরেজ লাইসেন্স নেই তাদেরও গ্যাস আমদানির লাইসেন্স দিচ্ছে। অনুমোদনহীনভাবে রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস মজুতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ব্যাপারে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, অবৈধভাবে কেউই বিস্ফোরক আমদানি করতে পারে না। চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণের পর বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে পুরান ঢাকায় কোনো কেমিক্যাল গোডাউন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অবৈধভাবে কেউ গোডাউন স্থাপন করলে সে বিষয়ে তথ্য দিলে বিস্ফোরক অধিদপ্তর অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। যারা যেটা করে সেটার নজরদারি তাদেরই থাকা উচিত। কিন্তু বিস্ফোরক অধিদপ্তরের জনবলের অভাবে আমরা করতে পারি না। তারপরও ঢাকা সিটি করপোরেশনের মধ্যে কোথাও কোনো অবৈধ গোডাউন থাকে-সে বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, বৈধ বা অবৈধ যে পথেই কেমিক্যাল আসুক না কেন, কোথায় মজুত করা হচ্ছে, কারা আনছে, কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, কী কাজে ব্যবহার করছে-সেটা সরকারকে জানানো জরুরি। যেহেতু আমরা কেমিক্যাল তৈরি করি না সেহেতু এটা আমদানি বন্ধ করা যাবে না। তবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কেমিক্যাল খালাসের পর এর পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট শিল্প মন্ত্রণালয়কে সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ কেমিক্যালগুলো অনেকটা অনিরাপদ অবস্থায় পরিবহন করা হয়। পরিবহনের একটি নীতিমালা থাকা উচিত। কেমিক্যালগুলো কীভাবে মজুত করা হচ্ছে-সে বিষয়েও নজরদারি থাকা জরুরি।
