ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী
দেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকে গত ২০ এপ্রিল ২০১৯ ‘যেভাবে এলো পবিত্র শবেবরাত’ নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। শবেবরাতের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত মহিমান্বিত রাত্রি নিয়ে বিভ্রান্তি কাম্য নয়। এ দিনটি মহিমান্বিত তবে এ উপলক্ষে অনৈসলামিক কার্যকলাপ বর্জনীয়। কুরআনের একটি আয়াত এবং অসংখ্য হাদিসে শাবানের মধ্য রাত্রির (লাইলাতুন নিসফী মিন শাবান) গুরুত্ব, এ রাতের এবাদত এবং পরবর্তী দিনের রোজার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ রাত্রি মূলত আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে শবেবরাত হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। শবেবরাত ফার্সি শব্দ যার অর্থ ভাগ্য রজনী। কেননা, আমাদের এ উপমহাদেশ দীর্ঘ প্রায় সাতশ বছর ধরে বিভিন্ন মুসলিম শাসক কর্তৃক শাসিত হয়েছিল যাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল ফার্সি।
উল্লেখ্য, এ মহিমান্বিত রজনী এবং পরবর্তী সময়ে দিনের যে গুরুত্ব তা মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি দেশেই উদযাপিত হয়ে আসছে সেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লামের যুগ থেকেই। বর্তমান সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিবসটি উদযাপিত না হলেও প্রতিটি মসজিদে এ রাতের মহিমা বর্ণনা করে বয়ান হয়। এই রাত্রির উত্সবকে কেবলমাত্র ভারত তথা বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারতের নব আবিষ্কৃত একটি বিদআত বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। একে শিয়াদের ইমামের জন্মদিন বলে আখ্যায়িত করাও ঠিক নয়।
মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের সূরা দুখানের শুরুতে ঘোষণা করেন, ‘শপথ প্রকাশ্য কিতাবের! নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন নাযিলের ফায়সালা করেছি। আমিই সতর্ককারী। আমারই নির্দেশক্রমে উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাময় বিষয়ের ফায়সালা হয়।’ (সূরা দুখান: ২-৪) স্বনামধন্য মুফাসসিরীনে কেরামগণ ‘লাইলাতাম মুবারাকা’ বলতে শাবানের মধ্য রাত্রি অর্থাত্ শবেবরাত বা লাইলাতুল বরাতকে চিহ্নিত করেছেন। পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ শুরু হয়েছে পবিত্র মহিমান্বিত ক্বদরের রজনীতে যা নিয়ে পরিষ্কার আয়াত রয়েছে সূরা ক্বদরে এবং কুরআনের আরো কিছু স্থানে। এই নিয়ে কারো কোনো সংশয় নেই। কিন্তু সূরা দুখানের ‘লাইলাতাম মুবারাকা’ বলতে ক্বদরের রাতকে বুঝানো হয়নি বলে মত দিয়েছেন বিখ্যাত অনেক মুফাসসিরীনে কেরাম। মুফাসসির কুল শিরোমণি রঈসুল মুফাসসিরীন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেন, ‘মহান আল্লাহ পাক লাইলাতুম মুবারাকাহ বলতে শাবান মাসের মধ্য রাতকে বুঝিয়েছেন (যা আমাদের কাছে শবেবরাত হিসেবে পরিচিত)। আল্লাহ পাক এ রাতে প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলোর ফায়সালা করে থাকেন।’ (দ্রষ্টব্য: ছফওয়াতুত তাফাসীর, তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে ইবনে কাছীর, কুরতুবী, কবীর, রুহুল বয়ান, আবী সাউদ, বাইযাবী, জালালাইন, কামলালাইন প্রভৃতি
রমযান মাস ব্যতীত একমাত্র শাবান মাসই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াআলিহী ওয়াসাল্লামের কাছে অত্যধিক প্রিয় মাস ছিল। রমযান ব্যতীত এ মাসেই তিনি অধিক রোযা পালন করতেন এবং নফল আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। এ মাসে আমরা যেন আমাদের আমল ও বাড়িয়ে দেই সে ব্যাপারে তিনি পরামর্শও দিয়েছেন। সহীহ বুখারি এবং সহীহ মুসলিমের বেশ কিছু হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে একথা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন রাবির শব্দে কিছু তারতম্য রয়েছে কিন্তু বিষয়বস্তু একই। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম শাবান মাস ব্যতীত বছরের অন্য কোনো মাসে এত অধিক সাওম (রোযা) পালন করতেন না। তিনি বলতেন, তোমরা যথাসাধ্য অধিক পরিমাণে ভালো কাজ কর। কারণ আল্লাহ তাআলা সওয়াব দিতে কখনো ক্লান্ত হন না বরং তোমরাই আমল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়। তিনি আরো বলতেন, বান্দা যে কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে করতে পারে, তাই আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়- তার পরিমাণ কম হলেও। ‘(সহীহ বুখারি: ১৮৪৬ ই ফা, সহীহ মুসলিম: ২৫৯০)
শাবানের মধ্য দিনের রোযার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম বলেন, কেউ যদি এ দিনের রোযা না রেখে থাকে সে যেন রমযানের পরে একটির বিনিময়ে দুইটি রোযা রাখে (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অনুরূপ একটি হাদিস এসেছে আম্মাজান আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) শাবান মাসে রোযা রাখতেন। আমি আরজ করলাম : হে আল্লাহর রাসূল! সকল মাসের মধ্যে কি আপনার নিকট শাবানে রোযা রাখা অধিক পছন্দনীয়? তখন তিনি ইরশাদ করেন: আল্লাহ তা’লা এ বত্সরে মৃত্যুবরণকারী প্রতিটি আত্মার নাম এ মাসে লিখে দেন। আর আমি এটা পছন্দ করি যে, আমার বিদায়ের সময় (যখন) আসবে তখন যেন আমি রোযা অবস্থায় থাকি। (মুসনাদে আবি ইয়ালা, ৪র্থ খণ্ড, হাদিস নং ৪৮৯০, দারুল কুতুব বৈরুত। হাদিসের মান সহীহ) উল্লেখ্য, সিহাহ সিত্তার অন্যতম গ্রন্থ ইবনে মাজায় শাবানের মধ্য রাত্রির অধ্যায়ে তিনটি হাদিসেই এ রাতের মহিমা বর্ণনা করা হয়। শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রাতে এবাদত করা এবং দিনের বেলা রোযা রাখা শিয়াদের আবিষ্কৃত কোনা উত্সব নয়, এটি বিদআতও নয়, বরং তা স্বয়ং আল্লাহ্?পাক কর্তৃক তাঁর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম মাধ্যমে প্রদত্ত এক বিশেষ মহিমান্বিত রজনী।
লেখক: শিক্ষক, লুন্দবিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন
