রাবিতে হিমেলের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা ট্রাকচালক গ্রেফতার

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:২৪

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে ট্রাকচাপায় গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের (২০১৭-২০১৮) শিক্ষার্থী মাহমুদ হাবিব হিমেলের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইনে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

বুধবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মতিহার থানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আরিফুর রহমান মামলাটি করেন। বাদ জোহর হিমেলকে নানাবাড়ি নাটোরে দাফন করা হয়েছে।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে আরএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তায় কাশিয়াডাঙ্গা থানা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হিমেলের ঘাতক ট্রাকের চালক মো. টিটু (৪২) ও তার সহকারী হামিম হোসেন কালুকে (২০) গ্রেফতার করেছে। গত মঙ্গলবার রাতের ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক ছিলেন। ট্রাকচালক টিটু কাশিয়াডাঙ্গার বালিগ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে। হেলপার কালু হরিপুর গ্রামের গান্দু হোসেনের ছেলে।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৯টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহীদ হবিবুর রহমান হল এলাকায় ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী শিক্ষার্থী হিমেল ঘটনাস্থলে নিহত এবং তার সঙ্গে থাকা বন্ধু রায়হান প্রামাণিক রিমেল গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা ক্যাম্পাসে নির্মাণসামগ্রী বহনের কাজে নিয়োজিত ছয়টি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেন এবং নির্মাণাধীন ভবনে বিক্ষিপ্ত হামলা ও ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে রাত ১১টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে ৬ দফা দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে—প্রক্টরসহ পুরো বডির পদত্যাগ, নিহতের পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, নিহত হিমেলের বোনকে রাবিতে চাকরি প্রদান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পালটানো এবং হিমেল মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে মামলা দায়ের ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা। রাত পৌনে ২টায় শিক্ষার্থীদের দাবি লিখিতভাবে গ্রহণ করেন উপাচার্য। এসময় শিক্ষার্থীরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

এদিকে নিহত হিমেলের পরিবারের সারা জীবনের ব্যয়ভার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার। বুধবার বেলা পৌনে  ১১টায় হিমেলের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে আনা হলে প্রথম জানাজার উদ্দেশ্যে সমবেত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি এই ঘোষণা দেন। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হিমেলের বন্ধু রিমেলের চিকিত্সার সমস্ত খরচও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহন করবেন বলে ঘোষণা দেন উপাচার্য। তিনি আরো বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর লিয়াকত আলীসহ প্রক্টরিয়াল বডির বেশির ভাগ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে ভারী যানবাহন প্রবেশ এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।

জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে রাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. লিয়াকত আলীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পদে নতুন নিয়োগ পেয়েছেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আসাবুল হক।

হিমেলের দাফন সম্পন্ন

গতকাল রাজশাহী থেকে পৌঁছার পর হিমেলের মরদেহ নাটোর শহরের কাপুড়িয়াপট্টির নববিধান উচ্চ বিদ্যালয়ে চত্বরে রাখা হয়। এসময় হিমেলের মা-খালা, নানা-নানি আত্মীয়স্বজন বন্ধু ও সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। হিমেলের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান নাটোর সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম শিমুলসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। ফুলে ফুলে ভরে যায় কফিন। হিমেলের মরদেহের সঙ্গে রাবির ভিসি, প্রোভিসিসহ শিক্ষক এবং তার সহপাঠীরা আসেন। এসময় রাবি ভিসি নিহত হিমেলের মাকে ৫ লাখ টাকার চেক তুলে দেন। পরে বাদ জোহর নাটোর পুরতান বাস টার্মিনাল পৌর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে গাড়িখানা গোরস্থানে হিমেলকে দাফন করা হয়। নিহতের মামা মো. মুন্না বলেন, ‘হিমেল খুব অল্প বয়সে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। আমার বোন আগে স্বামীহারা ছিলেন, এখন সন্তানহারা হলেন। এ কষ্ট মেনে নেওয়া কঠিন।’

হিমেলের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে আনা হয়।

শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, হিমেলদের বাড়ি বগুড়ার শেরপুর শহরের উলীপুর পাড়ায়। বাবা আহসান হাবিব হেলাল পৌরসভায় চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকে খুবই নম্র, ভদ্র আর শান্ত স্বভাবের ছিলেন হিমেল। চার বছর আগে বাবা মারা যান। একমাত্র ছেলে হিমেলকে নিয়েই অনেক স্বপ্ন দেখতেন তার মা মনিরা আক্তার। লেখাপড়া শিখে ছেলে একদিন বড় সরকারি অফিসার হবে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ উলীপুরপাড়াস্হ হিমেলের বাড়ি ও আশপাশের এলাকা। তার মৃত্যুর খবর শুনে স্বজনদের পাশাপাশি সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধবসহ পাড়া-মহল্লার লোকজন বাড়িতে আসছেন। কেউই মেনে নিতে পারছেন না হিমেলের এই অকাল মৃত্যু। 

ইত্তেফাক/ আরাফাত