ঢাকার খাল উদ্ধার ও সুরক্ষা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:৪৮

একসময় ঢাকায় জালের মতো ছড়াইয়া ছিল আঁকাবাঁকা খাল, বিল ও ঝিল। বৃষ্টি হইলে পানি খাল, বিল ও ঝিল হইয়া নদীতে পড়িত। পানির সহিত ময়লা-আবর্জনা ধুইয়া পরিষ্কার হইত শহর। এই খালগুলি সংরক্ষণ করিয়া ঢাকা শহরের সম্প্রসারণ যদি সম্ভব হইত, তাহা হইলে পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দনীয় রাজধানী হইত ঢাকা; কিন্তু সেই সুযোগ আমরা হেলায় হারাইয়াছি। ফলে এখন আমরা পদে পদে বিড়ম্বনা পোহাইতেছি। খালগুলি দখল ও দূষণের শিকার হইবার পর এখন সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীতে দেখা দেয় দুঃসহ জলাবদ্ধতা। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ঢাকা মহানগরবাসীর দুর্ভোগের শেষ থাকে না। তবে এইবার দুর্ভোগ লাঘবে পূর্ব হইতেই কাজ শুরু করিয়াছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ওয়াসার নিকট হইতে ঢাকার খালগুলি উদ্ধার, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্ব পাওয়ার পর দুই সিটি করপোরেশন মহাপরিকল্পনা লইয়া অগ্রসর হইতেছে। বিশেষ করিয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪২টি স্পটে খনন কাজ পরিচালনা করিবে বলিয়া রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে ইত্তেফাকে। এই ক্ষেত্রে জরিপপূর্বক খালের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণ করিয়া খালের সীমানা পিলার বসাইবে সেনাবাহিনী। ইহার পর ম্যাপ ধরিয়া উদ্ধার অভিযান ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলিবে।

প্রশাসনের উদাসীনতা ও প্রভাবশালী মহলের দখল-দূষণ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক খালের অস্তিত্বই এখন আর নাই। তবে যেই কয়টি খাল এখনো বিদ্যমান আছে, সেইগুলিকে উদ্ধার ও রক্ষা করা আজ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। এই সকল খালের অধিকাংশেরই নাই নিরবচ্ছিন্ন পানির প্রবাহ। সীমানাও অনির্ধারিত। কোনো কোনোটিতে আবার পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ বিদ্যমান। ফলে মূল সীমানা ধরিয়া খালগুলি উদ্ধারে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হইতে হইবে। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় খালের সংখ্যা ৭৩টি। যদিও ২০১৬ সালে করা ঢাকা জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ জরিপ বলিতেছে, খালের সংখ্যা ৫৮টি। তখন এই কথাও বলা হইয়াছিল যে, উল্লিখিত খালের ৩৭টিতেই রহিয়াছে দখলদার। ময়লা-আবর্জনা ফালাইবার কারণে অনেক খালের গতি আজ রুদ্ধ। শহরের চারিপার্শ্বের নদীর সহিত অধিকাংশ খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এই পরিস্থিতিতে খালগুলি উদ্ধার ও উন্নয়নের কাজে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যদিও সেনাবাহিনীর মূল কাজ দেশের প্রতিরক্ষা; কিন্তু তাহাদের আজ উন্নয়নমূলক নানা কাজেও সম্পৃক্ত করা হইতেছে। এই সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই; কিন্তু ইহা বেসামরিক প্রশাসনের জন্য কতটা লজ্জাকর তাহা আমাদের বুঝিতে অসুবিধা হয় না। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও তো এই দেশের সন্তান। তাহারা পারিলে বেসামরিক প্রশাসন পারিবে না কেন? পরিবেশ-পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে যে, এই ধরনের বড় বড় জনকল্যাণকর কাজে তাহাদের সম্পৃক্ত না করিয়া আমাদের কোনো উপায়ও নাই।

ঢাকার খালগুলি সিএস ও আরএস রেকর্ড বিবেচনায় লইয়া শুধু উদ্ধার করিলেই চলিবে না, এই উদ্ধার প্রক্রিয়াকে টিকসই করিতে হইলে খাল সংরক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ লইতে হইবে। এই সকল কাজে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও নাগরিকদের একযোগে সহযোগিতা প্রদান করিতে হইবে। খালগুলির প্রাণপ্রবাহ ফিরাইয়া আনিতে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার সহিত সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে খাল রক্ষা করিবার ব্যবস্থা হিসাবে ইহার পাড়ে ওয়াকওয়ে ও সাইকেল লেন নির্মাণ করিতে হইবে। ব্যবস্হা গ্রহণ করিতে হইবে সবুজায়নেরও। খাল খনন করিয়া খালে পানির ধারণক্ষমতা বাড়াইতে হইবে এবং কার্যক্ষেত্রে জলযান চলাচলের ব্যবস্হা করিতে হইবে। খালের পানি যাহাতে দূষিত না হয়, সেই জন্য কোনোক্রমেই পয়োনিষ্কাশন লাইনের সংযোগ খালের মধ্যে সরাসরি দেওয়া যাইবে না। প্রয়োজনে বায়োলজিক্যাল সেফটিক ট্যাংক নির্মাণের কথা ভাবিতে হইবে। সকল খাল, জলাশয় ও নদীকে লইয়া একটি ব্লু নেটওয়ার্ক গড়িয়া তুলিতে হইবে। 

ইত্তেফাক/ আরাফাত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন