সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন, যেখানে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়টি এমন নয় যে, বাংলাদেশ সরকার সহসা এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার ফলে এ দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্বের জন্য তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার দৃষ্টিতে এশিয়ায় চীনের ক্রমশ উত্থানজনিত পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্হিতিতে নিজেদের ভূরাজনৈতিক কৌশলকে তারা নতুন করে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয়েছে। বিশ্বমানবাধিকার পরিস্থিতি যদি বাস্তবিক অর্থেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ বিবেচনার কারণ হয়ে থাকে, তাহলে সর্বাগ্রে তাদের মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
সারা বিশ্বে এমন অনেক দেশই আছে যেখানে নিত্য মানবাধিকার পরিস্থিতি আমাদের চেয়েও অবনতিশীল। এটাও বলার অবকাশ নেই যে, আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তবে এই সময়ে এসে তাদের হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনায় যা পরিষ্কার হয়ে উঠে, তা হলো, ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক করা সত্ত্বেও সরকার গৃহীত ব্যবস্থায় তারা সন্তুষ্ট নয়। আর এই ব্যবস্থাকে দেখা হচ্ছে বাইডেন প্রশাসনের জন্য এক নতুন ভূরাজনৈতিক কৌশল হিসেবে, যার দ্বারা তারা সারা বিশ্বের কাছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার নিয়ে তাদের অবস্থানের দিকটি নতুন করে উচ্চারণ করে কিছু রাষ্ট্রকে একধরনের চাপের মধ্যে রাখতে চাইছে, যারা চীনের অর্থনৈতিক শক্তির কাছে অনেকটা নিজেদের সমর্পণ করেছে।
আজকাল আমাদের দেশের রাজনীতিতে ‘লবিস্ট’ বিষয়টি এ ধরনের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আমরা জানি, সেখানে লবিস্ট নিয়োগের কালচারটি অনেক পুরোনো। যে কোনো বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কাছে এই লবিস্টদের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। এর অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে লবিস্টদের বিশেষ কোনো প্রভাব রয়েছে। এখানে যে বিষয়টি বুঝবার অবকাশ রয়েছে, তা হচ্ছে সেখানকার প্রশাসন যখন তাদের নিজস্ব কর্মকৌশল দ্বারা কোনো দেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে যায়, সে ক্ষেত্রে লবিস্টদের প্রতিবেদন কিছুটা নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারে মাত্র। সামগ্রিকভাবে নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অন্য কোনো দেশের পরিস্থিতি কিংবা আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিগুলোকে তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটা সম্পর্কযুক্ত মনে করে তার ওপর। আমাদের দেশের সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছে, আবার সরকারের দিক থেকেও কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানিয়েছেন, সরকার তার হূত ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে লবিস্ট নিয়োগ করে প্রকৃত ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে তুলে ধরবে। এই পালটাপালটি অবস্থান থেকে এটাই বলা যায় যে, আমরা যদি বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত কারণ সত্যিই না বুঝে থাকি, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নতি করার আদতে কোনো সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ আগ্রহী করে তুলেছে। একই সঙ্গে ভারতকে অতিক্রম করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ ঘনিষ্ঠতাও যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তুলেছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যেখানে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে, বিশ্বে সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং এখন পর্যন্ত তারাই এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, সেখানে পরিস্থিতি সামলে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান অব্যাহত থাকা আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চিত্রকে নাটকীয় পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে আঁকড়ে ধরে তারা কিছু রাষ্ট্রের ওপর এমনভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যার মধ্য দিয়ে কার্যত রাষ্ট্রগুলোকে চীনের বলয় থেকে বের করে নিয়ে এসে চীনকে কোণঠাসা করাই মূল উদ্দেশ্য। আর সেজন্যই আমরা যখন দেখি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন এই কথিত গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার চর্চায় চরমভাবে ব্যর্থ, সেখানে এটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো সরব হতে দেখা যায় না। আর এর মূল কারণ এরা একে অপরের সহযোগী, যা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, আর তা হচ্ছে বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন দেখা গেছে, তা হচ্ছে এশিয়ার শক্তিধর চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু ভারতকে সঙ্গে নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা। আর যেহেতু বিল ক্লিনটনের শেষ সময় থেকে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চীনের উত্থানের এই সময়ে তা আরো শক্তিশালী হয়েছে, সেহেতু বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অভিন্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধের আপাত একটা ফায়সালা হলেও কোভিড-১৯-জনিত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সার্বিক বিচারে চীনের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছে এবং বর্তমান বাইডেন প্রশাসনের ঘাড়ে এই পরিবর্তনকে সামাল দেওয়ার গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে। এক্ষেত্রে তারা তাদের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র এই উভয় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতে দিতে নারাজ। এছাড়া আদর্শিকভাবেও যেহেতু দুটি দেশ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে, সে ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবেই তাদের চাই নিখাদ আস্থা এবং বিশ্বাসের সম্পর্ক। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় এক বাংলাদেশ ছাড়া প্রত্যক্ষভাবে অপরাপর দেশগুলোতে বর্তমানে চীনপন্থি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এশিয়ায় চীনকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া।
এদিকে আবার এ কথাও বলা যায় যে, বাংলাদেশকে চীনের দিক থেকে ফিরিয়ে ভারতের প্রতি বিশ্বস্ত রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র কার্যত তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন মনে করে। এর মূল কারণ বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা, মিয়ানমারকে মোকাবিলা করে ভবিষ্যতে চীনকে বার্তা দেওয়া, চীনের বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আছে কি নেই কিংবা মানবাধিকার পরিস্থিতি কতটুকু সন্তোষজনক এর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিরাপদ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। এ দেশে আগামী বছরগুলোতে চীনের দিক থেকে যে পরিমাণ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, এসব কিছু যদি সত্যিকার অর্থে আলোর মুখ দেখে, তাহলে বাংলাদেশ এবং চীন একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জালে আবদ্ধ হয়ে যাবে। এখন থেকেই বাংলাদেশকে সতর্ক করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যত বর্তমান সরকারের কাছে আগামী নির্বাচনের আগে এটা এমন একটা বার্তা হিসেবে দেখা যায় যে, বর্তমান সরকারকে ভবিষ্যতে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাদের সন্তুষ্ট করে চলতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে যে গুরুত্ব দিচ্ছে না, তেমনটাও ভাবার অবকাশ নেই। আমরা জানি, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টেলিফোনে কথা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন এন্থনি ব্লিংকেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনু বিভাগের একজন পরিচালককে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিষয়টা যদি কেবল বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে এ নিয়ে হয়তো তেমন দুর্ভাবনা থাকত না। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক কোনো দেশ নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। এটিকে আমলে না নিয়ে কেবল চীনকে সঙ্গী করে বাংলাদেশ যদি তার স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা করে তাহলে নিকট ভবিষ্যতে নিজেদের একঘরে করে ফেলার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এমনিতেই বিগত প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সন্তুষ্ট নয়, এ নিয়ে ইতিমধ্যে একাধিক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এহেন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যদি অনড় থাকে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নড়েচড়ে বসতে পারে, যা আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপদ ডেকে আনতে পারে। আমাদের পণ্য ও সেবা রপ্তানির শতকরা ৮০ ভাগের বেশি যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে। এক্ষেত্রে চীনের দিক থেকে অধিক মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগ কোনোভাবেই আমাদের রপ্তানি সামর্থ্যের বিকল্প হতে পারে না।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসতে হবে। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনকে নিজের প্রয়োজনেই আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আর এই বোধোদয় থেকে আমরা যে উদার গণতন্ত্র এবং মুক্তবাজার অর্থনীতিকে ধারণ করে আছি, সেখান থেকে কক্ষচ্যুত না হয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক একটি সহনীয় পর্যায়ে বজায় রাখা যায়, সেটাই এই মুহূর্তে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভাবনা হওয়া উচিত।
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
