উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে নির্বাচন এবং ভোট লইয়া বরাবরই প্রার্থী, ভোটার তথা সকল স্তরের জনগণের মধ্যেই উত্সাহ-উদ্দীপনা, আলোচনা-সমালোচনা, তর্কবিতর্ক বিরাজমান থাকে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোট নাগরিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। ভোটের মাধ্যমেই নাগরিকগণ সংশ্লিষ্ট এলাকায় যোগ্যতম প্রার্থীকে নির্বাচিত করিয়া থাকেন। তৃতীয় বিশ্বের অনেক ধরনের নির্বাচনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আলামত দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার ফলে এই সকল নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া হানাহানি, মারামারি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং সহিংসতাও কম হয় না; তাহার পরও নির্বাচনে ভোটারদের ভূমিকাই সর্বাধিক; কিন্তু জনগণের বিপুল অংশ যদি সেই নির্বাচনের প্রতি অনাগ্রহী হয়, উদাসীন হয়, নিরুত্সাহিত হয়, তাহা হইলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীকে বাছাই করিয়া লওয়া সম্ভব হইবে কী করিয়া! দেখা যায় যে, জনগণ ঘরে বসিয়া সমালোচনা করিতে উত্সাহী; কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাইতে উত্সাহী নহে। এখন প্রশ্ন হইল—তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের বিপুলসংখ্যক জনগণের মধ্যে এই যে ভোটের প্রতি উদাসীনতা তৈরি হইয়া থাকে—কেন এই অনীহা? ইহা লইয়া আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন; কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসা না করিয়া ঘরে বসিয়া আলোচনা-সমালোচনার তুফান ছুটাইলে তাহা অক্ষমের প্রলাপ বই আর কিছুই হয় না।
উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচন তথা ভোটে নিরুত্সাহী জনগণ অনেক সময় মনে করিয়া থাকে, অমুক মার্কার প্রার্থীর অনেক আগ্রাসি কর্মী রহিয়াছে; সুতরাং তাহাদের পছন্দের বিপরীতে ভোট দিলে হয়তো বিপদ হইবে। অথচ বাস্তবতা হইল, কর্মীদের তুলনায় সাধারণ ভোটারের সংখ্যা হাজার গুণ বেশি। জনগণই সকল শক্তির উৎস, ইহা কথার কথা নহে; কিন্তু তাহারা ইহা ভুলিয়া যায়। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যেই সকল কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকেন তাহাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রহিয়াছে। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সকল দায়িত্ব অর্পিত হয় প্রিজাইডিং অফিসারের উপর। প্রিজাইডিং অফিসার ভোটকেন্দ্রের নিয়মশৃঙ্খলা বিধানের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া ভোট কার্য পরিচালনা করেন। তাহার অধীনে কাজ করিয়া থাকেন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ অন্যরা। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের নিজ নিজ এজেন্ট। ইহার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও মোতায়েন থাকেন। ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা-মারামারি কিংবা কেন্দ্র দখলের কোনো ঘটনা ঘটিলে তাহা দক্ষতার সহিত দমন করা এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব। ইহার পরও ভোট গ্রহণে কোনো অনিয়ম কিংবা নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হইলে প্রিজাইডিং অফিসার রিটার্নিং অফিসার কিংবা সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করেন। জনগণ যদি তাহাদের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হইত তাহা হইলে কেহই তাহাদের রুখিয়া দিতে সাহস পাইত না। একটি ছোটখাটো ইউনিয়নেও কম করিয়া হইলেও ২০ হইতে ৩০ হাজার লোকের বসবাস। এই সকল ভোটার যদি ভোটকেন্দ্রে যায়, তাহাদের নিজেদের ভোটাধিকার বুঝিয়া লইতে চাহে, তাহা হইলে তাহাদের কে আটকাইবে? জনগণকে বুঝিতে হইবে তাহারা যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, তাহা হইলে নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে প্রকৃত লড়াই হইবে না। নিজের দেশ কিংবা ভোটের এলাকা লইয়া তাহারা যদি উদাসীনতা এবং অনীহায় ডুবিয়া থাকে তাহা হইলে দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসিবে না। জনগণ ভোটকেন্দ্রে না আসিলে সেই সুযোগে যেই নৈরাজ্য সৃষ্টি হইবে, তাহাতে বিপদটা তাহাদেরই আরো বৃদ্ধি পাইবে।
দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫০ বৎসর হইয়াছে। স্বাধীনতার এত বৎসর পর আসিয়াও জনগণ যদি তাহাদের অধিকার বুঝিয়া না লইতে পারে, নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে সচেতন না হয় তাহা হইলে ইহা পক্ষান্তরে দেশেরই ক্ষতি। জনগণ যদি ভোটকেন্দ্রে আসিয়া নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে উহা শুধু খারাপ প্রার্থীকেই আটকায় না, ভালো প্রার্থীদেরও আসার পথ সুগম করিয়া দেয়। সুতরাং নিজেদের ভোটের বহুবিধ মূল্য জনগণকে বুঝিতে হইবে।
