ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রামের কিছু অংশে, ময়মনসিংহের দক্ষিণাংশে, সিলেটের উত্তরাংশে, কুমিল্লার পূর্বাংশে, নোয়াখালীর উত্তর-পূর্বাংশে ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ভূমি রয়েছে। অনুকূল পরিবেশ আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বহু আগেই পাহাড় হতে পারত কৃষির এক অনন্য উদাহরণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তির পর ধীরে ধীরে পার্বত্য জেলাগুলোতে অস্থিরতা কমতে থাকলে কৃষি সম্প্রসারণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে থাকে।
পৃথিবীর বহুদেশের কাছে বাংলাদেশের কৃষি এখন রোল মডেল। পাহাড়কে ঘিরে কৃষি সম্প্রসারণের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। পাহাড়ের উন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন কৃষি প্রকল্প। আগে সেখানে সনাতন পদ্ধতিতে চাষবাস হতো, নতুন কোনো ফসল ছিল না। মূলত কোনোরকম খেয়েপুষে চলত কৃষি। উৎপাদন ছিল নগণ্য। কিন্তু গত এক দশকে পাহাড় যেন হয়ে উঠেছে কৃষির স্বর্গরাজ্য। পার্বত্য জেলাগুলোতে প্রায় ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়। তবে পাহাড়ের মাটি কিছুটা অম্লীয় ধাঁচের এবং ঢালু প্রকৃতির হওয়ায় সূর্যের আলো বেশি পড়ে; ফলে মাঠ ফসলের চেয়ে উদ্যান ফসল চাষের জন্য পাহাড় বেশি উপযোগী। পাহাড়ি অঞ্চলে উদ্যান ফসলের চাষ হয় প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর জমিতে; যার মাঝে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে কলা, ১১ হাজার হেক্টর জমিতে আম ও ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হচ্ছে। উদ্যান ফসলের মধ্যে ফলের আধিক্য লক্ষণীয়। সেখানে প্রায় ২০ ধরনের ফল সফলতার সঙ্গে চাষ হচ্ছে। দেশি ফলের পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে বিদেশি ফলও। মাল্টা ও ড্রাগন ফল খুব ভালোভাবে হচ্ছে।
বর্তমানে পাহাড়ে আম, কলা, কাঁঠাল, লেবু, আনারস, মাল্টা, ড্রাগন ফলের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে। আলোচনার সুবিধার জন্যে খাগড়াছড়ি জেলার চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। শুধু খাগড়াছড়ি জেলায় কৃষি অর্থনীতিতে বছরে লেনদেন হয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খাগড়াছড়ির তথ্যমতে সেখানে ছোটবড় মিলে সাত শতাধিক আমবাগান রয়েছে। গত মৌসুমে ৩২৪৪ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে যার প্রাক্কলিত বাজার-মূল্য ধরা হয়েছিল ১১৬ কোটি ৭৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। খাগড়াছড়ি জেলায় রয়েছে প্রায় ৫০০ লিচুবাগান। গত মৌসুমে লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০,৫১৫ মেট্রিক টন, আনারস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৫১১৬ মে. টন, কলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮৭ হাজার ৮৭৫ মে. টন, মাল্টা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৮৯ মে. টন, কাঁঠাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭৮ হাজার ১৫৬ মে. টন, বছরে ৫২ মে. টন ড্রাগন উৎপাদিত হয় যার বাজার-মূল্য এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া মসলা চাষের জন্যে অনুকূল। শুধু খাগড়াছড়ি জেলায় চলতি মৌসুমে ৪৫০০ হেক্টর জমিতে হলুদ চাষ হয়েছে। সেখানে বছরে ১৬৫০০ মেট্রিক টন শুকনা হলুদ উৎপাদিত হয়। পাহাড়ের বাজার অনুসারে প্রতি টন হলুদ বিক্রি হয় ১ লাখ টাকায়। সেই হিসেবে এর বাজার মূল্য প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। বছরে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আদা চাষ হয়। মৌসুমে উৎপাদিত হয় প্রায় ৪০১০০ মে. টন আদা। খাগড়াছড়ি জেলায় রেড লেডি পেঁপের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। এ থেকে সহজে অনুমেয় কৃষির বিস্তার পাহাড়ি অন্য জেলাগুলোতেও দাপটের সঙ্গে হচ্ছে।
করোনাকালে পার্বত্য জেলাগুলোতে নবোদ্যমে নতুন নতুন ফলের বাগান স্থাপিত হয়েছে। যদিও পাহাড়ের কৃষিতে সেচের সমস্যা রয়েছে, তবু সেখানকার কৃষি সমৃদ্ধ হয়েছে দিন দিন। পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটগুলো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আবহাওয়া উপযোগী জাতের সম্প্রসারণের কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করছে। মূলত ক্রপ জোনিং-এর কারণে কৃষি সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার পাহাড়ি এলাকায় কফি, কাজুবাদাম চাষে গুরুত্বারোপ করেছে। বিনামূল্য কৃষকদের মাঝে এইসব গাছ বিতরণ করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন অনুসারে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এ তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত ৫ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদী পড়ে রয়েছে। প্রকৃতি ও বিরাজমান ফসলের ক্ষতি না করে এইসব অনাবাদী জমি কফি ও কাজুবাদাম চাষের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে এই দুই ফসল থেকে বছরে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব, যা বাংলাদেশের জন্যে এক মাইলফলক হবে। দেশের মানুষের কাছে কফি দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে কাজুবাদামের আমদানির চিত্র দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৮ হাজার কেজি কাজুবাদাম আমদানি হয়েছিল, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কাজুবাদাম আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ৮০ হাজার কেজি। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে কাজুবাদামের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩২ গুণ। এভাবে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা শুধু কফি ও কাজুবাদাম আমদানির কারণে বিদেশ চলে যাচ্ছে। সরকার পাহাড়কেন্দ্রিক কফি ও কাজুবাদাম সম্প্রসারণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটা পুরোপুরি সফল হলে সব টাকা দেশেই থাকবে। তবে এজন্যে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণশিল্পকে আরো জোরদার করতে হবে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এখানে। কাজুবাদামের আন্তর্জাতিক চাহিদাও লক্ষণীয়। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৩৫ লাখ টন কাজুবাদাম উৎপাদিত হয়, যার বাজার-মূল্য প্রায় ৯.৮ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং সক্ষমতা বাড়লে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক বাজারে দাপট দেখাতে পারবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে পাহাড়ে ধরা দিয়েছে কৃষির অপার বিস্ময়। বাংলাদেশের কৃষি যেন এক নান্দনিক ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে।
চলমান করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে যেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা রুদ্ধ হয়েছিল, সেখানে কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। সুতরাং কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে আগামীতে চলতে হবে। কৃষকশ্রেণী তথা কৃষি উদ্যোক্তাদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে—তবেই আমাদের কৃষির অগ্রযাত্রা চলমান থাকবে। পরিশেষে, কবি রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণীর কবিতার ভাষায় বলা যায়—‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,/দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা।’ এমন আশা নিয়ে আমাদের কৃষিনির্ভর দেশ এগিয়ে যাক বীরদর্পে।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ফুলপুর, ময়মনসিংহ।
