জলাভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবহার

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৭:৩০

জলাভূমি হ্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ও সংরক্ষণে জাতিসংঘের আয়োজনে ক্যাম্পিয়ান সাগরবর্তী ইরানের রামসার শহরে ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি একটি কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত হয়ে আসছে। জলাভূমির প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনে রামসার কনভেনশনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ জলাভূমি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়। জলাভূমি হ্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া এবং জলাভূমিগুলোতে উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের প্রতিবেশ ব্যবস্থা যথাযথভাবে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও উদ্যোগ গড়ে তোলার উদ্দেশেই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাওড় সমৃদ্ধ একটি দেশ। 

দেশে মোট ৩৭৩টি জলাভূমি আছে, যার মোট আয়তন ৮,৫৮,৪৬০ হেক্টর। এই জলাভূমির রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। জলাভূমি আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ উদ্ভিদ, ফল ও খাদ্যশস্যের আধার। নিছক মাছের আবাসস্থল নয়, এখানে জন্মানো জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে। আমাদের কৃষিকাজ জলাভূমির পানির ওপর নির্ভরশীল। জলাভূমির পানি শোধনাগার, মৎস্য ও প্রাণীকূলের আবাসস্থল। জলাভূমি ভূগর্ভের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু দ্রুত নগরায়নে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের অধিকাংশ জলাভূমি। আর শহরের জলাভূমি ভরাটের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। জলাভূমি অপব্যবহারে ইতিমধ্যে অনেক জলাভূমি হারিয়ে গেছে। বিকাশমান নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে জলাভূমিগুলো শ্রেণি পরিবর্তন হয়ে আবাসিক ও বাণিজ্যিক অবকঠামোয় রূপান্তরিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে জলাভূমি সংরক্ষণ ও দেখাশোনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। কিন্তু দিনের পর দিন জলাভূমি মার্কেট, প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হাউজিং প্রকল্পে রূপ নিচ্ছে। এখানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্হাগুলোর দায়সারা দায়িত্ব পালনের কারণে গ্রাম ও শহরের বিদ্যমান জলাভূমি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া উন্মুক্ত প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দেওয়ায় সেগুলো ডোবা ও নালায় পরিণত হচ্ছে। ফলে মৎস্য ও জলজ প্রাণীর বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ খালের মতো অবকাঠামোর জন্য গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র প্লাবন ভূমিতে প্রায় ২ কোটি হেক্টর জলাভূমি বিলীন হয়ে গেছে। 

১৯ শতকের শুরুতে যে চলনবিলের আয়তন ছিল ১০৮৫ বর্গকিলোমিটার, তা ১৯০৯ সালে এসে দাঁড়ায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে, আর বর্তমানে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে সারা বছর কম-বেশি পানি থাকে। বাংলাদেশে পানির ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা জাতীয় পানি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জলাভূমির জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। পানির ব্যবস্থাপনায় জলাভূমির ব্যবস্থাপনা চলছে। তবে এভাবে চলতে থাকলে অল্প দিনে জলাভূমি বিলীন হয়ে যাবে। রামসার কর্তৃপক্ষ গত বছর জলাভূমি দিবসের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের ৬৪ শতাংশ জলাভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে এসব জলাভূমির উপর নির্ভরশীল মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জীবনযাত্রা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাভূমি রক্ষায় স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায় জলাভূমি চিহ্নিত করা, নির্বাচিত জলাভূমি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা, জলাভূমি ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে সর্বস্তরে টেকসই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এজন্য জলাভূমির বিষয়ে বাড়াতে হবে গণসচেতনতা। 

ইতিমধ্যে সরকারিভাবে জলাভূমি অপব্যবহার রোধে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জলাভূমি উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অর্পিত দায়িত্বপালন নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া জলাভূমি রক্ষার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সমন্বয় অত্যাবশ্যক। মানুষের জন্য জলাভূমির ভূমিকা সব সময় বিবেচনায় রাখতে হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি