মনের স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দিতে হইবে

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:৫২

প্রায় শত বৎসর পূর্বে করোনা ভাইরাসের মতো ‘স্প্যানিশ ফ্লু’র মহামারির পর আত্মহত্যার হার বাড়িয়া গিয়াছিল। বিশ্বব্যাপী মহামারি ঘটনা ঘটিলে অনেকেরই মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। এই মহামারিকালেও বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হইয়াছে। সম্প্রতি আবু মহসিন খান নামের ৫৮ বৎসর বয়সী এক ব্যবসায়ী ফেসবুকে লাইভে আসিয়া নিজের মাথায় গুলি করিয়া আত্মহত্যা করেন। মানুষ কৌতূহলপ্রিয়। এই জন্য এমন নৃশংস দৃশ্য দেখিতে অনেকেই নিজেদের কৌতূহল চাপিতে পারেন না। গণ-হিস্টিরিয়ার মতো আত্মহত্যারও একটি ছোঁয়াচে ব্যাপার রহিয়াছে। বিভিন্ন সময় দেখা গিয়াছে, কোনো গ্রামে একজন কেহ আত্মহত্যা করিলে তাহার দেখাদেখি সেই গ্রামে পরপর অনেকেই আত্মহত্যা করিয়া থাকেন। সুতরাং এই সময় লাইভ ভিডিওতে আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পাইতে পারে। ইহা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা বটে।

মহসিন খানের সুইসাইড নোট হইতে আমরা জানিতে পারি, তাহার ব্যবসায়ে ধস নামিয়াছিল। যাহাদের সহিত তাহার আর্থিক লেনদেন ছিল, তাহারা টাকা দেন নাই। তিনি পারিবারিক নানা হতাশার কথাও লিখিয়াছেন। তবে মহসিন খানের সমস্যা বিশ্লেষণ করিয়া তাহার আত্মহত্যার কারণ উদ্ঘাটন করা এত সহজ কাজ নহে। চলমান মহামারিতে কোটি কোটি মানুষ আর্থিক সমস্যার ভিতর দিয়া দিন যাপন করিতেছেন। লক্ষ লক্ষ লোকের ব্যবসায়েও ধস নামিয়াছে। তাহারা তো মহসিন খানের মতো দল বাঁধিয়া আত্মহত্যা করিতেছেন না। তাহা হইলে মহসিন খান কেন আত্মহত্যা করিলেন? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আত্মহত্যা করিবার নেপথ্য কারণ যথেষ্ট জটিল। একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হইতে হইতে আত্মহত্যা করিবার মতো স্তরে চলিয়া গিয়াছে কি না, তাহা পরিবারের লোকজন তো দূরের কথা, ঐ ব্যক্তি নিজেও অনেক সময় বুঝিতে পারেন না। কেহ কি চাহে এই সুন্দর পৃথিবী হইতে নিজেকেই নিজে শেষ করিয়া দিতে? সুতরাং, মূল ব্যাপার হইল শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখা। সমস্যা হইল আমাদের দেশে মানসিক সমস্যার জন্য ৯২ শতাংশ মানুষই কোনো প্রকারের সেবা বা পরামর্শ গ্রহণ করেন না। আর যাহারা চিকিৎসা লইতে যান, তাহারাও সমস্যা দেখা দেওয়ার প্রথম দিকে নহে, বরং একেবারে শেষ মুহূর্তে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আরেকটি সমস্যা হইল, দেশের মানুষ মনে করেন, তাহার যে মানসিক সমস্যা রহিয়াছে ইহা প্রকাশিত হইলে তিনি ও তাহার পরিবার সমাজের চোখে হেয় হইয়া যাইবেন। ইহাও সত্য যে, বাংলাদেশে মানসিক রোগীদের ভালোভাবে দেখা হয় না। এমনকি হাসপাতাল কর্মী বা যাহারা এর চিকিৎসার সহিত জড়িত তাহারাও মানসিক রোগীদের সহিত যথাযথ ব্যবহার করেন না বলিয়া বিস্তর অভিযোগ রহিয়াছে। সুনির্দিষ্ট করিয়া বলা যায় যে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব প্রকটভাবে রহিয়াছে। মেডিক্যাল কলেজ কিংবা টারশিয়ারি পর্যায় ব্যতীত আর কোথাও এই সেবা পাওয়া যায় না। বিশেষায়িত হাসপাতাল রহিয়াছে মাত্র দুইটি। ১৭ কোটি মানুষের জন্য এই মুহূর্তে মাত্র ২৭০ জন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রহিয়াছেন। আর কাউন্সেলিংয়ের জন্য সাইকোলজিস্ট রহিয়াছেন মাত্র ২৫০ জন। অথচ উন্নত বিশ্বে ফি বৎসর শারীরিক, পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের চেকআপ করা হয়। দেশে মেডিক্যাল সেক্টর বহু ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সম্প্রসারণ ঘটাইয়াছে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার ক্ষেত্রটি এখনো বিশ বাঁও জলে রহিয়া গিয়াছে। তাহার কারণ হইল, মানসিক স্বাস্থ্যকে কেহ শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বই দিতে চাহে না। অথচ মানুষ বাঁচে মানসিকভাবে।

দীর্ঘ মৃত্যুচিন্তা ও মানসিক সংকটের সময় নিজের মানসিক সমস্যার কথা সঠিক কোনো মানুষের সঙ্গে শেয়ার করিবার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক সংকটাপন্ন ব্যক্তিটি যদি বুঝিতে পারেন, তাহার সবচাইতে খারাপ থাকার সময়েও পাশে কেহ একজন আছেন, তাহা হইলে হয়তো তিনি বাঁচিয়াও যাইতে পারেন। সুতরাং পরিবারের সকল সদস্য পরস্পরের পাশে থাকুন, বন্ধু-স্বজনের দিকে হাত বাড়াইয়া দিন।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন