বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি 

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:০৫

বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনা বাহান্নর পরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। লাখো মানুষের ত্যাগে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃতে ৯ মাসব্যাপী সর্বাত্মক যুদ্ধে দেশের মানুষ জয়ী হয়। অগণিত মানুষ এই যুদ্ধে গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার হন। তাদের অসামান্য আত্মত্যাগে ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

বাংলাদেশের অভ্যুদয় এই অঞ্চলের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গতিপথের ওপর বহুমুখী রেখা তৈরি করে। বাংলাদেশ চর্চা তথা আধুনিক বাঙালির ইতিবৃত্ত পুনর্গঠনের জন্য সেসব রেখায় ঘাত-অভিঘাত অনুধাবন জরুরি। অন্যথায় বাঙালি জাতির রাজনৈতিক জাগৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গটি নানাবিধ বিকৃত ভাষ্যের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সেসব বিকৃতির কিছু বিস্তারও ঘটতে দেখা গেছে। তা থেকে পরিত্রাণ জরুরি। শুরুতে জানা জরুরি, গৌরবময় এই অর্জনে মুক্তিযুদ্ধচর্চার নানা মাত্রা রয়েছে। তবে কাঠামোভিত্তিক চিন্তা করলে বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, গণযুদ্ধ, গেরিলাযুদ্ধা, বধ্যভূমি, গণহত্যা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা হলেও মুক্তিযুদ্ধের লাখ লাখ শরণার্থী নিয়ে মাঠ পর্যায়ে আরো বিস্তৃত গবেষণা ও জানা প্রয়োজন।

বলা যায়, ইতিহাস-ঐতিহ্যবোধের অভাবে নতুন প্রজন্মের অনেকে মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক মূল্যায়ন করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম, যাদের সামনে এই মুক্তিযুদ্ধ বয়ানসংক্রান্ত রাজনৈতিক বিরোধগুলোর পর্দা উন্মোচিত হচ্ছে—সেটার সঙ্গে মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাধারণ যোদ্ধাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

বাস্তবতা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশে গত ৪৮ বছরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাত্র ৪০টি পিএইচডি গবেষণা হয়েছে? এর মধ্যে ৩৫টি হয়েছে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে? বাংলাদেশিরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাঁচটি পিএইচডি করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায় (২৬ মার্চ ২০১৯ ডয়চে ভেলে)।’ সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি কতটা দূরে, এই খতিয়ান নিয়ে নিবন্ধের অবতারণা।

জেনোসাইড অব স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১০ সালে। এখানে স্থায়ী গবেষণায় কাজ করেন দুই জন। বিভিন্নভাবে যুক্ত আছেন ২০ জন। পরিচালক হিসেবে আছেন ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। তিনি মনে করেন, এ ধরনের সেন্টার প্রতিষ্ঠান আরো আগে করতে পারলে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম আরো বাড়ত।

বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগটি শুরু হয় ২০১৭ সালে। শিক্ষার্থী ভর্তি ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে। আসন সংখ্যা ৩০। কোটা থেকে আসে আরো ১০ জনের মতো। শিক্ষক তিন জন। পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন শামীম রেজা। তিনি বলেন, আমাদের সিলেবাসে প্রথম বর্ষে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশবিষয়ক ১০০ নম্বরের একটি কোর্স চালু আছে, তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। আশা রাখি, আরো হবে এই চর্চা।

বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগ: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে কোনো বিভাগ বাংলাদেশে ছিল না। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা এই ধরনের পঠন-পাঠনের প্রথম উদ্যোগ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান। তার একান্ত উদ্যোগে ১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে ইউজিসি এই বিভাগ খোলার অনুমোদন দেয়।

২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয়ের ইতিহাস’ শীর্ষক কোর্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে অবশ্য পাঠ্য হিসেবে অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে পরবর্তী সব ব্যাচের প্রথম বর্ষে এই কোর্স আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পঠিত হচ্ছে। বিভাগের চেয়ারম্যান ড. দিব্যদু্যতি সরকার জানান, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়। বর্তমানে (২০২১) এই বিভাগে চারটি ব্যাচ রয়েছে; শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। চতুর্থ বর্ষে রয়েছেন ১২ জন থিসিস স্টুডেন্ট, যারা সবাই মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা করছেন। এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা চালু করার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন রয়েছে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনীতি, উন্নয়ন ও ইতিহাস এই বিভাগের মূল পাঠ্য। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক জ্ঞানের বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয় এই বিভাগের অন্যতম পাঠ্য। উচ্চতর গবেষণার জন্য বিভাগে সম্প্রতি ‘মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ল্যাব’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিহাস ও বাংলাদেশ স্টাডিজ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ড. মো. হাবিবুল্লাহ জানান, মাত্র দুই জন শিক্ষক দিয়ে বিভাগ পরিচালিত হয়। ১৬-১৭ সেশন থেকে এই অবধি ২০০ ছাত্রছাত্রী আছেন। সিলেবাস মূলত বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণীত ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড বাংলাদেশ স্টাডিজ করা হয়েছে। এই বিভাগে শিক্ষক ছয় জন। মোট শিক্ষার্থী পাঁচ জন। পিএইচডি তিন জন। এমফিল দুই জন। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে এমফিল করছেন এক জন। এছাড়া আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা চলমান।

পরিচালক সানজিদা পারভীন (সহকারী অধ্যাপক) জানান, নিয়মিত কাজের পাশাপাশি আমরা ‘সমাজ ও প্রগতি’ এবং ‘Society and Progess’ নামে দুটি জার্নাল প্রকাশ করি। দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। মুজিববর্ষ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিতব্য। এছাড়া সম্প্রতি ৭ মার্চ ২০২১ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। ‘৭ মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাত্পর্য’ শিরোনাম প্রবন্ধ উপস্হাপন করেছেন। ১৭ মার্চ ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্হাপন করেছেন প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান শাহীন। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট। চালু আছে এমফিল, পিএইচিডি কোর্স। এছাড়া গবেষণা, সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান অনিয়মিত হয়ে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এ ছাড়াও আলোচনা ও গবেষণা করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তারা গণহত্যার অনেক স্মৃতি সংরক্ষণ করেছেন। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খুলনায় গণহত্যা জাদুঘর। প্রশিক্ষণ দিয়েছে তারা এ পর্যন্ত ৪৫০ জন বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আগ্রহী গবেষককে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে শহিদদের স্মরণে অনেক সংগ্রহশালা, স্মৃতিসৌধ করেছে। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি আছে বলে মনে করেন লেখক-গবেষকেরা।

এক সাক্ষাত্কারে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা খুবই কম হয়েছে, যা হয়েছে তা হলো কেউ হয়তো তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন অথবা কেউ হয়তো তার রাজনৈতিক চিন্তা থেকে লিখেছেন? আবার কেউ কেউ নিজের স্মৃতিকথা লিখেছেন। বীরত্বগাথা লিখেছেন। এগুলো গবেষকদের কাজে লাগতে পারে। ইতিহাসের জন্য প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু এগুলো তো গবেষণা বা ইতিহাস নয়। মুক্তিযুদ্ধের ওপর আমাদের হয়তো ১০ হাজার বই হয়ে গেছে। তার মধ্যে আমি বলব, সাড়ে ৯ হাজার বইকে আমরা গবেষণামূলক বই বলতে পারব না। এছাড়া বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে আমাদের ইংরেজি এবং আরো অনেক ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের বই প্রয়োজন। আমার হিসাবে, ইংরেজিতে বইয়ের সংখ্যা দশমিক পাঁচ ভাগ। এর থেকে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি এখনো কতটা দুর্বল।

লেখক: কবি ও গবেষক 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন