সরাসরি পণ্য রপ্তানির নতুন আশা

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৫:১৭

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এই দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। একসময় পাটশিল্প ছিল আমাদের রপ্তানিমুখী অর্থনীতির প্রাণশক্তি। সেই স্থানে এখন পোশাকশিল্পের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। ফলে এই তৈরি পোশাকশিল্পের যে কোনো সুখবরে আমরা আনন্দিত ও আশান্বিত না হইয়া পারি না। এই মুহূর্তে দেশের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক খবর হইল, প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম হইতে ইতালির রেভেনা বন্দরে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করিতে যাইতেছে। এই উদ্দেশ্যে ‘এমভি সোঙ্গা চিতা’ নামে একটি জাহাজ বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করিতেছে। সবকিছু ঠিক থাকিলে ইহা আগামীকাল ৭ ফেব্রুয়ারি ইতালির উদ্দেশে রওয়ানা করিবে। ৯৪৫ টিইইউএস খালি কনটেইনার এবং ক্যাপিটাল মেশিনারি ভর্তি সাত টিইইউএস কনটেইনার লইয়া জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসিয়াছে। যাওয়ার সময় ৯৮৩ টিইইউএস কনটেইনার লইয়া যাইবে। এইগুলির ৯৮ শতাংশই তৈরি পোশাক। ইতালির ক্রেতাদের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের ক্রেতাদের অর্ডার করা তৈরি পোশাক থাকিতেছে এই জাহাজে।

কোভিড-১৯ মহামারি বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী বাণিজ্যের জন্য গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ইহার পর করোনা পরিস্হিতির কিছুটা উন্নতি হইলে বিদেশ হইতে একের পর এক তৈরি পোশাকের অর্ডার আসিতে থাকে। এই সময় বিদেশি জাহাজের বুকিং পাওয়া দুষ্কর হইয়া পড়ে। প্রসঙ্গত বলিয়া রাখা ভালো যে, চট্টগ্রাম বন্দর হইতে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার কেলাং ও তেনজুং পেলাপাস এবং চীনের কয়েকটি বন্দর হইয়া আমাদের রপ্তানিপণ্য অন্যান্য দেশে যাইতেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে অধিক গভীরতার মাদার ভ্যাসেল ভিড়িতে না পারায় রপ্তানি পণ্যবাহী মাঝারি ও ছোট আকারের জাহাজে পণ্য লইয়া যাইতে হয় ঐ সকল বন্দরে। সেইখান হইতে বড় জাহাজে করিয়া ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে যায় আমাদের পণ্যবাহী কনটেইনারগুলি। ইহাতে রপ্তানিপণ্য পাঠাইতে খরচ ও সময় দুইটাই অধিক লাগে। ইহা একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। বে-টার্মিনাল ও মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হইলে এই সমস্যা আর থাকিবে না। চট্টগ্রাম বন্দরকে অনেকে আসলে একটি নদীবন্দর হিসাবেই গণ্য করেন। এই কারণে এখনো বড় আকারের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসিতে পারিতেছে না। তবে আর্থিকভাবে লাভজনক হইবে না বলিয়া ছোট জাহাজে সরাসরি ইউরোপে পণ্যবাহী জাহাজও এতদিন পরিচালনা করা হয় নাই। কেননা, আমরা যেই সকল দেশে পণ্য রপ্তানি করি, সেই সকল দেশ হইতে আমদানি করি কম। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতার কারণে বর্তমান উদ্যোগ কতটা টেকসই হইবে তাহা এখনো নিশ্চয়তা দিয়া বলা যাইতেছে না। আলোচ্য জাহাজটিও আসিবার সময় অনেকগুলি কনটেইনার খালি লইয়া আসিয়াছে। ইহার পূর্বে গত ডিসেম্বরেও চট্টগ্রাম হইতে সরসারি ইউরোপে একটি জাহাজ পরীক্ষামূলক যাত্রা করে। এখন মাসে দুইটি জাহাজ নতুন রুটে চলাচল করিবে বলিয়া জানা যায়।

ক্রেতাদের হাতে আমাদের পণ্য দ্রুত পৌঁছাইয়া গেলে অন্যান্য দেশের সহিত প্রতিযোগিতায় আমাদের সক্ষমতা বাড়িবে নিঃসন্দেহে। পণ্য রপ্তানিতে তখন দেখা দিবে নূতন দিগন্ত। ছোট জাহাজে হইলেও সরাসরি পণ্য রপ্তানির এই উদ্যোগেরও আমরা সাফল্য কামনা করি। কেননা, আলোচ্য উদ্যোগের ফলে পূর্বে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হইয়া গেলে যেই ভাড়া লাগিত ১৬ হাজার ডলার, তাহা এখন লাগিবে ১০ হাজার ডলারেরও কম। তাহা ছাড়া পণ্য পরিবহনে ৩০ দিনের জায়গায় লাগিবে ১৫ দিনেরও কম। অতএব, চট্টগ্রাম-ইতালি রুটে জাহাজ পরিচালনার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ানোরও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এইভাবে উত্তর আমেরিকার বন্দরগুলির সহিতও সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চালু করা যাইতে পারে। উল্লেখ্য, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, হংকং, চীনসহ আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলি সরাসরি ইউরোপে পণ্য রপ্তানি করিতেছে। আমাদেরও একইভাবে সফল হইতে হইলে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণসহ মাদার ভ্যাসেল ভিড়িতে পারে—এমন সক্ষমতাসম্পন্ন ও আধুনিক সমুদ্রবন্দর গড়িয়া তুলিতে হইবে। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন