বাংলাদেশ ও আমেরিকার সম্পর্কটি কী, তা এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বাইডেন সরকার হঠাত্ কেন মানবতাবাদী হয়ে উঠল এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বাংলাদেশের র্যারের কর্মকর্তাদের ওপর আমেরিকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করল, তার মতলব বোঝা খুব কষ্টকর নয়।
আমেরিকা এখন বিশ্বরাজনীতিতে কোণঠাসা। গত বারো বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। তাদের আক্রমণে এক ইরাকেই লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে। আফগানিস্তানে তারা যে ধ্বংসকাণ্ড করেছে, তার সঙ্গে হিটলারের ইউরোপ আক্রমণের তুলনা চলে।
সিরিয়া ও ইরানেও তারা আক্রমণের পাঁয়তারা করেছিল। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় আমেরিকা সবকিছু হারিয়েছে। ট্রাম্পের মতো একজন চরম মানবতাবিরোধী ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে সে দেশের যেটুকু সুনাম অবশিষ্ট ছিল তা-ও ধ্বংস করে গেছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন এই সুনাম উদ্ধার করতে না পেরে যে নীতি অনুসরণ করছেন, তা ট্রাম্পের নীতিরই অনুসরণমাত্র।
আমেরিকায় বহুকাল ধরে বিএনপি ও জামায়াত লবিস্ট নিয়োগ করে হাসিনা সরকারবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। এ সম্পর্কে বহুকাল আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে মাহমুদ আলীকে লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসে বসে আমরা সতর্ক করেছিলাম। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাতে বেশি গুরুত্ব দেননি। এখন শুনছি, বাংলাদেশ সরকার এই বিশ্বব্যাপী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আমেরিকায় লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তারা যে বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণার তুলনায় একেবারেই দুর্বল, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের ব্যবস্থা গ্রহণই তার প্রমাণ।
বাংলাদেশ সরকার বড় দেরিতে মাঠে নেমেছে। তাদের মাঠে নামার আগেই বিরোধী পক্ষ খেলায় গোল দিয়ে ফেলেছে! আমেরিকা এই প্রচারণারই সুযোগ গ্রহণ করেছে। বাঘ যেমন কূপে পড়ে গিয়ে শৃগালের মাথায় পা রেখে কৌশলে কূপ থেকে উঠেছিল, তেমনি আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে গিয়ে কূপে পড়ে গেছে। এখন যুদ্ধ করেও কূপ থেকে উঠতে পারছে না। আমেরিকার বিশ্ব আধিপত্য এখন পতনের মুখে। তাই কূপ থেকে ওঠার জন্য তাদের একটি শৃগাল প্রয়োজন। এশিয়া ও আফ্রিকার আর কোনো দেশকে এই শৃগাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পেরে, বাংলাদেশকে তারা বেছে নিয়েছে।
বাংলাদেশে র্যাব প্রতিষ্ঠা করেছে বিএনপি-জামায়াত সরকার। তারাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করেছে। আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা শাহ কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টারসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে বিএনপি। হাসিনা সরকারের উচিত ছিল ক্ষমতায় এসেই এই র্যাব ভেঙে দেওয়া এবং সন্ত্রাস দমনের জন্য নতুন নামে র্যাব পুনর্গঠন করা। তারা তা করেনি। আমেরিকা তাই র্যাবের বিচ্ছিন্ন দু-একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা আমেরিকার নেতৃত্বে চারটি দেশের (অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারতসহ) নতুন জোট কোয়াডে (Quad-Quadrilateral Security Dialogue) যোগ দিতে বাধ্য হয়। এই চাপ সৃষ্টির ব্যাপারে ভারতেরও কিছুটা নীরব সম্মতি আছে। কারণ চীনবিরোধী কোয়াডে বাংলাদেশ যাতে যোগ দেয়, তা ভারতেরও ইচ্ছা।
এশিয়া ও আফ্রিকায় চীনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণে আমেরিকা ও ভারত সমভাবে ভীত। বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে ভারত চাপ দিতে পারছে না। কারণ ভারতে মোদি সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে মানবতাবিরোধী নির্যাতন চালাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশকে কিছু বলতে তাদের চক্ষুলজ্জা আছে। তাই আমেরিকাকে সম্ভবত নীরব সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করার।
প্রশ্ন হলো, যে আমেরিকা তেলের স্বার্থে ইরাকে বারো বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি রেখে সতেরো লাখ নারী ও শিশু হত্যা করেছে, ঐ ইরাকেই অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে আরো কয়েক লাখ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে অন্যায় যুদ্ধে হত্যা করেছে, যারা নিজেদের তথাকথিত মিত্র রাষ্ট্র পাকিস্তানের অনুমতি না নিয়ে তাদের একটা দেশে এলিট ফোর্স ঢুকিয়ে কাপুরুষের মতো ওসামা বিন লাদেনকে সপরিবারে হত্যা করেছে, সেই আমেরিকার মুখে এই মানবতার বাণী কি আজ শোভা পায়? আন্তর্জাতিকভাবে এটা স্বীকৃত, আমেরিকার জর্জ বুশ এবং ব্রিটেনের টনি ব্লেয়ার মিথ্যা কথা বলে তাদের দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে এই অন্যায় যুদ্ধ করেছিলেন।
জার্মানির নাত্সীরা অন্যায় যুদ্ধ করেছিল বলে নুরেমবার্গের আদালতে তাদের বিচার ও ফাঁসি হয়েছিল। সেই একই অন্যায় যুদ্ধ করার জন্য জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের বিচার হলো না কেন? বিশ্বখ্যাত নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার ২০০৫ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর টেলিভিশনে প্রদত্ত লাইভ বক্তৃতায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের নুরেমবার্গ আদালতের আসামিদের মতো যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হবে না কেন? এখনো কেন তাদের গ্রেফতার করছে না? আন্তর্জাতিক আদালত কি তাদের বাসস্থান খুঁজে পাচ্ছে না? পিন্টার একা নন, আরো অনেক ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবী এই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের কোনো বিচার হয়নি। তারা এখনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে মানবতাবাদী সেজে লম্বা লম্বা কথা বলে বেড়াচ্ছেন।
আমি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এ কথা বলতে পারি, হাসিনা সরকারের শাসনামলে র্যাবের বিচারবহির্ভূত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড অন্যায় হলেও, পরবর্তী সময়ে তাদের কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশে জঙ্গিদের সন্ত্রাস বন্ধ করা যেত না। যেভাবে মুক্ত বুদ্ধিজীবীদের তারা হত্যা করা শুরু করেছিল এবং রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত হত্যা করেছিল, তাকে একটা যুদ্ধ বলে আখ্যা দেওয়া যায়। সন্ত্রাসীদের এই যুদ্ধ ঘোষণার বিরুদ্ধে ব্যাবেরও যুদ্ধ ঘোষণার প্রয়োজন ছিল। র্যাবের হস্তক্ষেপে দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হওয়ার পর আজ আমাদের সুশীল সমাজ বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিতে পারে। কিন্তু সন্ত্রাস যখন ভয়াবহভাবে চলছিল, তখন তারাই বলছিলেন, সন্ত্রাসীদের কেন কঠোরভাবে দমন করা যাচ্ছে না?
পৃথিবীর যে কোনো দেশেই অন্তর্ঘাত নিবারণের জন্য র্যাবের মতো বাহিনী গঠন করা হয়। ব্রিটেন ও আমেরিকার স্পেশাল-এলিট স্কোয়াডের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে আমরা জানি, যেমন—ব্রিটেনের SOCA, আমেরিকার নেভি সিলস-মেরিনস ইত্যাদি। এমআইসিক্স, সিআইএ তো আছেই। তাদের এ সমস্ত সংস্থার কাহিনী যদি প্রকাশ করা হতো, তাহলে চেঙ্গিস খান ও হালাকু খান লজ্জায় মাথা নত করতেন। হিটলারের সৈন্যবাহিনী ইউরোপে আর কী অত্যাচার-নির্যাতন করেছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ অত্যাচার করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে। গুয়ানতানামোর কথা কি আমাদের সুশীলদের মনে আছে? তার বিচার কোথায়? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আজ বিশ্বব্যাপী যে অপপ্রচার চলছে, তা শুধু বিএনপি ও জামায়াতের নয়, এই প্রপাগান্ডার পেছনে আসল শক্তি জোগাচ্ছে পাকিস্তান।
তাদের অর্থে তারেক রহমান লন্ডনে রাজকীয় কায়দায় বসবাস করে এই প্রপাগান্ডায় সাহায্য জোগাচ্ছে। তারা বেছে বেছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে একশ্রেণির লেখকদের অর্থ দিয়ে বই লেখাচ্ছে। এ ব্যাপারে তারা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর এক ভাইয়ের মেয়েকেও তাঁবেদার বানিয়েছিল, তেমনি তাঁবেদার বানিয়েছে পিনাকী ভট্টাচার্য নামে এক ব্যক্তিকে। স্বদেশ থেকে পালিয়ে এসে এই অর্থে ইউরোপে রাজার হালে বাস করছে এবং বাংলাদেশবিরোধী বই লিখছে। এসব বইয়ের তথ্য আধা সত্য, আধা মিথ্যা। এগুলোর প্রতিবাদ করার জন্য প্রত্যেক দেশেই বাংলাদেশ দূতাবাসে একজন করে প্রেস মিনিস্টার আছেন। একমাত্র লন্ডনের প্রেস মিনিস্টার আশিকুন্নবী অপপ্রচার রোধের জন্য ব্রিটিশ সাংবাদিকদের মধ্যে কাজ করে কিছুটা সফল হয়েছেন।
এছাড়া আর কারো কোনো সাফল্যের খবর রাখি না। সারা ইউরোপ এবং সারা মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ তথা হাসিনাবিরোধী প্রচারণা এখন তুঙ্গে। আরবি ভাষায় বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচারণার জন্য বেতার স্টেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমরা শুধু সৌদি আরব থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এনে দেশে মাদ্রাসা বানাচ্ছি। মাঝখান থেকে পাকিস্তান অসত্য প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশ সম্বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যেও মিথ্যা প্রচারণা চালাতে পারছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু শাসক হয়তো বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছে। কিন্তু জনগণ আরবি ভাষায় প্রচারিত বেতার অনুষ্ঠান দ্বারা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ সীমিত।
তাই তারা হয়তো পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো শেখের অঢেল অর্থ দ্বারা এই বিভ্রান্তিকর প্রচারণার জবাব দিতে পারছে না। তাই বলে চুপ করে থাকা চলবে না। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করে এই প্রচারণার সঠিক জবাব দিতে হবে। দেশের মিডিয়াগুলোকেও এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে।
আমি জানি, দেশের বহু বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক হতাশায় ভুগছেন। সরকারের কাছে তারা কোনো পাত্তা পান না। আমলারা এসব কাজের মোড়ল। তাদের মধ্যে অনেক সাবোটিয়ারও রয়েছে, যারা চায় সরকারের সুনাম নষ্ট করতে। আওয়ামী লীগ আমলাতন্ত্রের নষ্টামি রোধ করতে পারত, যদি শক্তিশালী ও সংগঠিত হতো। আমলা চক্রের পক্ষ এখন ভূতের বাড়ির মামার মতো। অতএব, তারা ষড়যন্ত্র রোধ করবে কীভাবে?
শেখ হাসিনা একটু সজাগ হন। আমি তার আমলা চক্রের কঠোর সমালোচনা শুরু করেছি। কিন্তু তার একাকিত্বের জন্য বেদনাবোধ করি। বঙ্গবন্ধু শেষ জীবনে বলেছিলেন, ‘আমার চারদিকে শুধু চাটার দল’। আজ হাসিনাকে চারদিক থেকে এই চাটার দল ঘিরে ফেলেছে।
শেখ হাসিনাকে এই চাটার দলের কবল থেকে মুক্ত হতে হবে। তাহলেই আমেরিকার প্রচারণার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। মার্কিন সাম্রাজ্য আজ পতনশীল। তাই বাংলাদেশকে মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনা, মাভৈঃ। শক্ত হয়ে দাঁড়ান। এই আধামৃত সাম্রাজ্যবাদের চিৎকারে তার বিচলিত হওয়ার দরকার নেই।
লন্ডন, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২
