গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিশ্বের ৩০০ বছরের গণতান্ত্রিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে গণতন্ত্র কয়েকটি দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্রসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সমস্ত দেশেরও মূল লক্ষ্যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। আর এর আলোকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চার মূলনীতির ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধান ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্হির করা হয়েছিল।
আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করে বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িককরণের মাধ্যমে পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হয়। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদকে বিভিন্নভাবে মদদ দেওয়া হয়।
বিগত দিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগসহ গণতান্ত্রিক শক্তি, এবং অন্যান্য সামাজিক শক্তি বাস্তবতা এবং বিরাজমান পরিস্হিতি বিবেচনায় নিয়ে জোটবদ্ধভাবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে সাম্য ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পার্বত্য শান্িতচুক্তি, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন এবং নারীর ক্ষমতায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিএনপি জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রাক্কালে এবং ক্ষমতাসীন হয়ে গণতান্ত্রিক শক্তি এবং বিশেষ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই কর্মকাণ্ড ভারত, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হয়। এর আগেও ১৯৯০-৯২ সালে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, আওয়ামী লীগসহ গণতান্ত্রিক শক্তি এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোট পায়। গত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং যা নিরপেক্ষ ও অবাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, তাতেও আওয়ামী লীগ প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পরে বর্তমান বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে ১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কারণে বিচারকাজ শুরু করে। এর বিরুদ্ধে এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক শক্তি ২০১৩-২০১৪ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর হামলা চালায়, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং রাস্তা অবরোধের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়। সেদিন ভারত বিভিন্ন ক্লান্িতকালের মতো সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার পক্ষে সরাসরি সমর্থন জানায়। ভারতের এই সমর্থনের কারণে বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশ হয় সহযোগিতা করেছে নয়তো নিশ্চুপ ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বিশ্বের কোনো কোনো শক্তি বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও বর্তমান সরকার তা উপেক্ষা করেও এই ব্যবস্হা অব্যাহত রাখে, দেশে-বিদেশে এই বিষয়টি প্রশংসিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে হেফাজত অন্যান্য অগণতান্ত্রিক শক্তির সহযোগিতায় ঢাকা অবরোধ সৃষ্টি করে। প্রশাসন শক্ত হাতে এর মোকাবিলা করে। গত এক দশকে অপশক্তি কক্সবাজারের রামু, পাবনার সাঁথিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এবং কুমিল্লার মুরাদনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিথ্যা অভিযোগ এনে হামলা চালায়। ঢাকার হলি আর্টিজনে জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা চালিয়েছিল, যার কারণে অনেক বিদেশি নিহত হয়। বিগত দুর্গাপূজার সময়ও অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই হামলার শিকার হয় এবং অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর অপতত্পরতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্হা রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় এ প্রতিষ্ঠানগুলি মানবাধিকার রক্ষা, যা গণতন্ত্রের সঙ্গে অবিচ্ছেদভাবে জড়িত, তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো দুর্বল অবস্হায় রয়েছে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যথাযথ কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত সার্বজনীন গণতান্ত্রিক সংবিধান এখনো মেনে নেয়নি, যা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রণীত। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে। নাগরিক সমাজের ব্যক্তিদেরও এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারি দল, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজ সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠবে এবং নির্বাচন ব্যবস্হাকে সুষ্ঠু অবাধ এবং নিরপেক্ষ করা সম্ভব হবে, যেটা গণতান্ত্রিক দেশসমূহে হয়ে থাকে। আমরা জানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ভারতসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে পার্লামেন্ট, প্রশাসন, বিচারব্যবস্হা, নাগরিক সমাজ, নির্বাচনব্যবস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। স্মরণ রাখতে হবে যে, সভ্যতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করেই বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ম~খ্য ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও সহযোগিতা করছে। আমাদের সভ্যতা কতগুলো রীতি ও নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত, এর মধ্যে কিছু রীতি ও নিয়ম সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে, বাকি বিষয়গুলো সুচিন্িতত ও সমন্বিত পদক্ষেপের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এই নিয়ম ও নীতিগুলো যে স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে তার মধ্য একটিও যদি বিন্দুমাত্র সরে যায়, সারা সভ্যতার পতন নিশ্চিত হবে। তাই গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি মোকাবিলা এই সত্য দিয়েই উপলব্ধি করতে হবে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্হায় গণতন্ত্র একটি দেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্হার ওপর গড়ে ওঠে, পাশাপাশি বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশসমূহের সহযোগিতাও প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। সাম্প্রতিককালে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে র্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উল্লেখ করেছে এবং কয়েক জন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। অবশ্য কংগ্রেসম্যান ও বিদেশ বিষয়ক কমিটির প্রধান গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস বলেছেন, তারা বাংলাদেশের ওপর নজর রাখছেন এবং বাংলাদেশ-আমেরিকার মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে।
আমরা জানি, ’৭৫-পরবর্তীকালে সরকারসমূহ সর্বজনীন সংবিধানকে বৈষম্যমূলক করে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদকে উসকে দিয়েছিল। চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বিরাট জনগোষ্ঠীকে দেশ ত্যাগেও বাধ্য করেছিল। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ পৃষ্ঠপোষকতার ফলে আইনের শাসন ব্যাহত হয়েছে এবং নারীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালে সারা দেশের বোমা হামলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রশাসনের সহযোগিতা রয়েছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দীর্ঘ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধসমূহ সংবিধানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনব্যবস্হা এখনো গড়ে ওঠেনি এবং পরিপূর্ণ আইনের শাসনেরও ঘাটতি রয়েছে। আমরা আশা করি, গণতান্ত্রিক দেশসমূহ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ গণতান্ত্রিক দেশসমূহ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্হাকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সহযোগিতা করবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিগত দিনের জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রশংসনীয় কাজকে আরো উত্সাহিত করবে, নিয়মনীতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে ও তা মেনে এগিয়ে যেতেও সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবে—জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বীর মুক্তিযোদ্ধা
