উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচন লইয়া বরাবরই আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক বিরাজমান থাকে। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যখন মারামারি, হানাহানি, অস্ত্রবাজি ও সহিংসতা মাত্রা ছাড়াইয়া যায় তখন তাহা চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইউপি নির্বাচনে কেন্দ্র দখলের জন্য প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গোলাগুলিতে লিপ্ত সহিংসতাকারীদের ছবি প্রকাশিত হইয়াছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া অস্ত্রবাজি, গোলাগুলি, সহিংসতা, কেন্দ্র দখলের ঘটনা আমাদের দেশে নূতন কিছু নহে। অতীতেও বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ক্ষমতার জোর খাটাইয়া কেন্দ্র দখল, দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা আমরা দেখিয়াছি। তবে উদ্বেগের বিষয় হইল, অতীতে বিভিন্ন সময় সহিংসতার ঘটনা ঘটিলেও আজকের দিনে আসিয়া একটি স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্র দখলের লক্ষ্যে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি, দুই পক্ষের গোলাগুলি, ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় না। ভাবিতেও অবাক হইতে হয়, যেইখানে নির্বাচন কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন, সেইখানে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র লইয়া মহড়া এবং গোলাগুলির ঘটনা এখনকার দিনে কী করিয়া ঘটে?
নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া সহিংসতা, অস্ত্রবাজি, ব্যালট দখলের ঘটনা শুধু এই দেশেই নহে, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সকল জায়গায় না হইলেও কিছু কিছু রাজ্যে ভয়াবহ আকারে দেখিতে পাওয়া যায়। সেইখানে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির কর্মীদের হানাহানি, মারামারি, নারী কর্মীদের প্রতি সহিংসতার যেই দৃষ্টান্ত দেখিতে পাওয়া যায় তাহা অবর্ণনীয়। ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা ক্ষমতার জোর খাটাইয়া বিরোধী দলের কর্মীদের দমাইয়া রাখিতে চাহে। আবার বিরোধী দলের কর্মীরা এক বিন্দু ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা হইতে হামলা-সহিংসতার ঘটনা ঘটায়। ফলাফলস্বরূপ নির্বাচন হইয়া দাঁড়ায় এক নির্মম যুদ্ধক্ষেত্র। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের লক্ষ্যই হইল নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি নাগরিকদের পক্ষে, নাগরিকদের হইয়া কাজ করিবেন, তাহাদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকিবেন, তাহাদের কল্যাণে নিয়োজিত থাকিবেন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়া তো বলিয়াই গিয়াছেন—অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল। এখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া রাজনৈতিক নেতা ও তাহাদের কর্মীরা এই যে অস্ত্রবাজি, দাঙ্গাহাঙ্গামা, সহিংসতার ঘটনা ঘটাইতেছে, উহাতে তো সাধারণ জনগণই হতাহত হইতেছে। যেই মানুষের জন্য ভোট এবং নির্বাচন, সেই মানুষকে মারিয়াই তাহারা ক্ষমতার সিঁড়ি বাহিয়া উপরে উঠিতে তত্পর। আবার তাহারাই বড় গলায় ভোটের কথা বলেন, গণতন্ত্রের কথা বলিয়া মুখে ফেনা তোলেন। উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এমন দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অস্ত্র প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা অব্যাহত থাকিলে একসময় সাধারণ ভোটাররাই নির্বাচন এবং ভোটের প্রতি আগ্রহ হারাইয়া ফালাইবে। দেখা যাইবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতেছে ঠিকই; কিন্তু সেইখানে ভোটার বলিতে কেহ নাই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ইহা কোনোভাবেই কাম্য হইতে পারে না।
সুতরাং এই ধরনের সহিংস পরিস্থিতি চলিতে পারে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণও দিনের পর দিন নির্বাচন লইয়া সহিংসতা-অনাচার চাহিয়া চাহিয়া দেখিবে না। নির্বাচনে যাহারা বন্দুক, চাপাতি লইয়া সহিংসতা ঘটায়, সাধারণ জনগণকে ভয়ভীতি দেখাইয়া নিজেদের পক্ষে ভোট প্রদানে বাধ্য করে কিংবা তাহাদের ভোটদান হইতে বিরত রাখে, তাহাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার করিয়া আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করিতে হইবে। নির্বাচনে অস্ত্রের অবাধ সরবরাহ বন্ধ করিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উভয়কেই তৎপর হইতে হইবে। আমরা নির্বাচনে অস্ত্রের মহড়া ও সহিংসতা দেখিতে চাহি না, সাধারণ জনগণ যাহাতে নির্ভয়ে তাহাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করিতে পারে তাহাই আমাদের কাম্য।
