২০২২ সালের ৭ ফেব্র‚য়ারি পালিত হয়েছে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই দিবসটির গুরুত্ব অপরিসীম। ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমালার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা ইশারা ভাষাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। ২০১২ সালে ২৬ জানুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৭ ফেব্র‚য়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাই বিগত বছরগুলোর মতো এবারও সারা দেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়েছে। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘বাংলা ইশারা ভাষার ব্যবহার, শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার।’
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে যে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ এই অনুচ্ছেদ ছাড়াও সংবিধানের মৌলিক অধিকার অনুচ্ছেদে আরো অনেক অধিকারের কথা এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ অন্যান্য অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণের অনুরূপ সমান অধিকার ভোগ করবেন। যোগাযোগ ও ভাষা ব্যবহারের অধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। এই ভাষা হতে পারে বাচনিক কিংবা অবাচনিক; কিন্তু এর মাধ্যমেই একজন নাগরিক তার মৌলিক অধিকার ও মতামত প্রকাশ করে থাকেন। ইশারা ভাষা একটি অবাচনিক ভাষার প্রয়োগ, যা শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যোগাযোগে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মহান জাতীয় সংসদে ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর পাশ করে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮। যার তপশিল (ক)-তে রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবী হিসেবে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টের পেশাগত লাইসেন্স প্রদানের নিমিত্তে নূ্যনতম যোগ্যতা নির্ধারিত হয়েছে বিএসসি ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি ডিগ্রি। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট রাষ্ট্রের নাগরিকের কথা, ভাষা ও যোগাযোগ এবং খাবার গ্রহণ ও গলাঃধকরণ প্রক্রিয়া সমস্যার চিকিত্সা প্রদান করে থাকেন। তাই বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীসহ নানা প্রতিবন্ধীর মানুষের জন্য ইশারা বা অন্যান্য অবাচনিক ভাষার কৌশল নির্ধারণ, কারো কারো ক্ষেত্রে সমস্যার ধরন ও মাত্রা অনুয়ায়ী স্বল্প হলেও বাচনিক ভাষার প্রয়োগ এবং সর্বোপরি ইশারা ভাষার সর্বজনীন ও শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে আইন দ্বারা স্বীকৃত দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির ব্যবস্থা করা জরুরি। বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে আদালত, থানা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টের ব্যবস্থা করার কথা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ধারা ২ (৭)-এও বলা হয়েছে, যা দ্রুত কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া দেশের নানা প্রান্তে শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ধর্ষণসহ নানারকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়, যা সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যেহেতু তারা তাদের অধিকারের কথা বলতে পারেন না, বা ন্যায়বিচার চাইতে অপারগ হন, তাই অনেকাংশে তারা তাদের ন্যাঘ্য বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিই নন, ক্যানসার বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে কণ্ঠনালির অপসারণ হওয়া ব্যক্তি, স্ট্রোক-পরবর্তী ‘এফাসিয়া’ আক্রান্ত অনেক ব্যক্তি, এপ্রাক্সিয়ার মতো জটিল ভাষাবৈকল্য, অটিজমসহ নানা স্নায়বিক বৈকল্যের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিরও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হতে পারে ইশারা ভাষা। এই ব্যাপারে দেশের সব সরকারি ও বিশেষায়িত স্কুল, হাসপাতাল, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনসহ সব সেবাকেন্দ্রে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টের নিয়োগ ও প্রকৃত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিত্সার ব্যবস্থা করা যেমন জরুরি তেমনি বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিবন্ধিতার মাত্রা ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির মাধ্যমে ইশারা ভাষা অন্য অবাচনিক ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করা এবং সামাজিক পুনর্বাসন ও যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের কর্মসংস্থান করাও খুবই দরকার। এতে তারা যেমন পরিণত হবে দক্ষ মানবশক্তিতে, তেমনি এগিয়ে যাবে একীভূত সমাজব্যবস্থার সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক: সভাপতি, সোসাইটি অব স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টস (এসএসএলটি)
