বিসিকের মূল উদ্দেশ্য যেন ব্যাহত না হয়

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:০৮

সময়টা ভালো নহে। চারিদিকে প্রতিকূলতার বাতাবরণ। একদিকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্হিরতা, অন্যদিকে করোনার জন্য বিগত দুই বত্সরে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হইয়াছে। আর্থিক সংকটে ধুঁকিতেছে কিংবা বন্ধ হইয়া গিয়াছে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সকলের চাইতে অধিক সংকটের মধ্যে পড়িয়াছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। ইহা ঠিক যে, সমগ্র দেশে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিকাশে বহুদিন ধরিয়াই বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) একটি সদর্থক ভূমিকা রহিয়াছে।

বিসিকের মূল উদ্দেশ্য হইল—সমগ্র দেশে কর্মসংস্হান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন, অর্থ ও মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন। বিগত এক দশকে দেশের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতের উন্নয়নে ছয়টি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ইহা মূলত বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পনগর গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি; কিন্তু এতদিনে ঐ সকল প্রতিশ্রুতির মধ্যে মাত্র দুইটি পুরাপুরি বাস্তবায়িত হইয়াছে। বাকিগুলির কোনো কোনোটির মূল কাজই শুরু হয় নাই। কোনোটির জমি অধিগ্রহণ হইয়াছে মাত্র, আবার কোনোটির প্রকল্পই পাশ হয় নাই এখনো। এইদিকে বিসিক শিল্পনগরীর প্লট ও শিল্প ইউনিট-সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গিয়াছে, বর্তমানে বিসিকের ৭৯টি শিল্পনগরে মোট শিল্পপ্লটের সংখ্যা ১১ হাজার ৬৩৬। ইহার মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে ১০ হাজার ৬৪৮টি। এই সকল বরাদ্দ করা প্লটে শিল্পকারখানা থাকিবার কথা ৫ হাজার ৯৯৮টি। তবে বর্তমানে উত্পাদনরত রহিয়াছে ৪ হাজার ৭৬৯টি কারখানা। বাস্তবায়নাধীন রহিয়াছে ৬৩৫টি। আর রুগ্ণ বা বন্ধ রহিয়াছে ৫৯৪টি শিল্পকারখানা।

আমাদের মূল ফোকাস এই বন্ধ হওয়া ৫৯৪টি শিল্পকারখানার দিকে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, বন্ধ হইয়া যাওয়া কারখানাগুলির অধিকাংশই ক্ষতির মুখে পড়িয়া বন্ধ হইয়াছে। বিসিকের নীতিমালা অনুযায়ী কারখানা চালাইতে না পারিলে স্বেচ্ছায় বিক্রয় করিয়া দিতে হয়, তাহা না হইলে প্লট বাতিল করিয়া নূতন উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দিয়া দিতে পারে বিসিক। সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষ বলিতেছে, এখন প্রকল্প প্রস্তাব পাইবার পর সম্ভাব্যতা যাচাই করিয়া উদ্যোক্তাদের প্লট দেওয়া হইতেছে। প্লট লইয়া প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে যদি কেহ কারখানা তৈরি না করেন, তাহা হইলে তাহাদের প্লট বাতিল করা হইতেছে। ইহার পাশাপাশি যাহারা দীর্ঘ সময় ধরিয়া কারখানা বন্ধ রাখিয়াছেন, তাহাদের প্লটও বাতিল করা হইতেছে। ইহা ঠিক যে, নিয়ম ও আইন অনুযায়ী চলিতেই হইবে। তবে বিসিক হইল দেশের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে নিয়োজিত সরকারি খাতের মুখ্য প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৭ সালে সংসদীয় আইনের মাধ্যমে বিসিকের জন্ম। বিসিকের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উদ্যোগে দেশে বিপুল শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্হাপিত হইয়াছে। বিশ্বায়ন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির বিবিধ প্রভাব হইতে বিসিক নীতিগতভাবে নূতন শিল্পোদ্যোগকে সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করিয়া থাকে। যেইহেতু করোনা পরিস্হিতির জন্য নূতন বিনিয়োগ ও অর্থের সংস্হানে সংকট রহিয়াছে, সুতরাং বিসিককে বুঝিতে হইবে নিয়মনীতির যূপকাষ্ঠে পড়িয়া তাহাদের মূল উদ্দেশ্য যেন ব্যাহত না হয়।

বিসিকের নূতন নূতন প্রকল্পের সমস্যাজটও খুলিতেছে খুব ধীরে ধীরে। ইতিপূর্বে আমরা বিসিকের প্রকল্প বাস্তবায়নে মোটাদাগে তিনটি সমস্যা দেখিয়াছি। প্রথমত, জমি অধিগ্রহণের জটিল প্রক্রিয়া, নানান প্রকারের মামলা-মোকদ্দমা থাকে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতার ঘাটতি। তৃতীয়ত, করোনার কারণে দুই বত্সর ধরিয়া প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অর্থ বরাদ্দ মিলিতেছে না। মনে রাখিতে হইবে, বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের মতো আমাদের দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতকে জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬তে শিল্পায়নের মূল চালিকা হিসাবে বিকশিত করিবার কথা বলা হইয়াছে। সুতরাং করোনার বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখিতে হইলে অন্যান্য খাতের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতকেও ঘুরিয়া দাঁড়াইতে হইবে এবং এজন্য সকল প্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখিতে হইবে। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন