প্রতিদিনের সোনালি সূর্য 

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:০৭

প্রতিদিন সোনালি সূর্য ওঠে আশার আলো নিয়ে, অস্তমিত হয় আরো নতুন নতুন আশার আলোয় জাগিয়ে তুলবে বলে। কর্মময় জীবন এভাবেই ঘড়ির কাঁটার মতো চলতে থাকে। শরীর না চাইলেও নিয়ম করে চেম্বারে যে চিকিৎসা দিতে হবে, আমার এ একনিষ্ঠতা জন্ম নিয়েছে সোনামণিদের দ্রুত আরোগ্য করে তোলার জন্য একধরনের দায়বদ্ধতা থেকে।

কোমলমতি সোনামণিদের অসুস্থতা ও অপুষ্টি নিয়ে মায়েদের সে কী ব্যাকুলতা, আর সুস্থ হয়ে উঠলে শিশুর নিষ্পাপ হাসি একবার কেউ দেখলে কি আজীবন ভুলতে পারে?

মায়েরা তাদের সন্তানের এমন কিছু অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাতে থাকেন, যার চিকিৎসা অনেকাংশেই নির্ভর করে রোগের সঠিক ইতিহাস নেওয়া ও শারীরিক লক্ষণের ওপর, খুব বেশি কিছু প্যাথলজি টেস্টের প্রয়োজন হয় না। এখন শীত জেঁকে বসেছে, মায়েরা প্রায়ই শিশুর প্রস্রাবজনিত সমস্যা, বিশেষ করে রাতে বিছানায় প্রস্রাব করা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, হয়তো ইতিমধ্যে তার মেয়ে শিশুর বয়স সাড়ে পাঁচ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাতে বিছানা শুকনো রাখেনি (বেড ওয়েটিং), শিশুকে নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে বিব্রত বোধ করেন। শিশু নিজেও বিমর্ষ হয়ে থাকে, কিছু চিকিৎসা নিয়েছেন উন্নতি হয়নি, খুব সম্ভবত শিশুটি নকচারনাল এনিউরেসিসে ভুগছে। এছাড়া প্রস্রাবের ইনফেকশানও বেড ওয়েটিং বা অজ্ঞাতসারে বিছানায় প্রস্রাব করার আরেকটি অন্যতম কারণ।

নকচারনাল এনিউরেসিস

— ১। পাঁচ বছর বয়সের পরেও রাতে অজ্ঞাতসারে মাসে কমপক্ষে দুই বার বিছানায় প্রস্রাব করা। সাধারণত রাতে বিছানা শুকনো রাখার বয়স তিন থেকে চার বছর।

২। পাঁচ বছর বয়সে আনুমানিক ২০ শতাংশ শিশুর প্রাইমারি নকচারনাল এনিউরেসিস থাকে, এদের মধ্যে পরবর্তী বছরপ্রতি প্রায় ১৫ শতাংশ শিশুর স্বাভাবিক নিয়মেই উপসর্গের উন্নতি হয়।

৩। নকচারনাল এনিউরেসিস মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে দু-তিন গুণ বেশি।

৪। পিতা-মাতা এনিউরেটিক হলে প্রতি শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৪ শতাংশ, উভয়ে এনিউরেটিক হলে তা বেড়ে হয় ৭৭ শতাংশ।

৫। নকচারনাল এনিউরেসিস দুই প্রকার :জন্মের পর থেকে বর্তমান বয়স পর্যন্ত কখনোই বিছানা শুকনো রাখেনি (প্রাইমারি) ৭৫-৯০ শতাংশ, ছয় মাস শুকনো রাখার পর পুনরায় রাতে বিছানায় প্রস্রাব শুরু করা (সেকেন্ডারি) ১০-২৫ শতাংশ।

৬। ৭৫ শতাংশ এনিউরেটিক শিশু শুধু রাতে বিছানা ভেজায়, ২৫ শতাংশ শিশু দিন ও রাত উভয় সময়ে।

৭। দরিদ্রতা, উদ্বাস্ত্ত, ভাই বা বোনের জন্মসহ পরিবারের কোনো সদস্যের মৃতু্যতে অতিরিক্ত মানসিক চাপ (সেকেন্ডারি এনিউরেটিক) থেকেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রোগ নির্ণয় :

১। মা-বাবা, শিশুর সেবাদানকারী এমনকি শিশুর স্কুল সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে রোগের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা গেলে রোগ নির্ণয়ে অনেকটা সহজ হবে।

২। শারীরিক লক্ষণ দেখে নকচারনাল এনিউরেসিসের অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

ল্যাব পরীক্ষা :

১। সাধারণত কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।

২। বিশেষ ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রুটিন, কালচার পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাফি (কিডনি) প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসা :

১। কাউন্সেলিং : চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাউন্সেলিং। শিশু ও অভিভাবকের উপস্থিতিতে শিশুর সমস্যা, রোগের গতি-প্রকৃতি ও চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝিয়ে বলতে হবে। স্বাভাবিক নিয়মেই সর্বোচ্চ ১৫ বছর বয়সের মধ্যে এনিউরেসিসের উপসর্গের উন্নতি হয়, যখন মূত্রথলির ওপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ধীরে হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এনিউরেসিস হার মাত্র এক শতাংশেরও কম। অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতে হবে যে, শিশু ইচ্ছাকৃতভাবে রাতে বিছানা ভেজায় না। শিশুটির পানি খাওয়ার অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সন্ধ্যা ৭টার পর দুই আউন্সের বেশি পানীয় খেতে দেওয়া যাবে না এবং বিকাল ৪টার পর অতিরিক্ত চা, কফি, চিনি খেতে বারণ করতে হবে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রস্রাব করানোর অভ্যাস করাতে হবে। উৎতম ফল পাওয়া যাবে, যদি শিশুটি ভালোভাবে আশ্বস্ত হয় এবং নিজ থেকে সক্রিয়ভাবে চিকিৎসায় অংশগ্রহণ করে।

২। শিশু ছয় বছরের বেশি হলে নির্দিষ্ট চিকিৎসা দিতে হবে।

সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো শিশুকে রাতে শুকনো থাকতে উদ্বুদ্ধ করা (মোটিভেশনাল থেরাপি), বিছানা শুকনো রাখার জন্য স্টার চার্ট রাখা ও পুরস্কৃত করা। বিছানা ভেজানোর জন্য তিরস্কার করা বা শাস্তি দেওয়া, এতে হিতে বিপরীত হতে পারে, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

৩। এনিউরেসিস অ্যালার্ম (কন্ডিশনিং থেরাপি) যা ডায়াপার ভেজানোর শুরুতেই উচ্চশব্দে বেজে উঠে ও শিশুকে জাগিয়ে তোলে, তখন শিশুকে টয়লেটে নিয়ে প্রস্রাব করানো যায়। সফলতার হার শতকরা ৩০-৬০ ভাগ।

৪। এতে উন্নতি না হলে দ্বিতীয় ধাপে ট্যাবলেট ডেসমোপ্রেসিন ০.২-০.৬ মি. গ্রাম ঘুমাতে যাওয়ার আগে খাওয়াতে হবে, তিন থেকে ছয় মাস। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য এখন ডেসমোপ্রেসিন নাকের স্পে্র আর ব্যবহূত হয় না। সফলতার হার শতকরা ৪০ ভাগ। কিছু রোগীকে ট্যাবলেট অক্সিবিউটাইনিন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ওষুধে উপসর্গের উন্নতি ঘটায় বটে, কিন্তু নির্মূল করে না, থেরাপি শেষে রিলাপস হওয়ার শতকরা হারও কম নয়।

৫। এতেও উন্নতি না হলে এবং শিশুর বয়স সাতেরো ওপর হলে তৃতীয় ধাপে ট্যাবলেট ইমিপ্রামিন ২৫ মি. গ্রাম ঘুমাতে যাওয়ার আগে খাওয়াতে হবে, দুই-তিন মাস, সফলতার হার ৩০-৬০ ভাগ।

৬। উপরিউল্লিখিত দুই ধরনের থেরাপি একযোগে ব্যবহারে আরো ভালো ফল পাওয়া যায়।

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, শিশু বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন