বাংলা ভাষায় কালজয়ী বলিয়া একটি শব্দ রহিয়াছে। এই শব্দটি কেন ব্যবহৃত হয়, কাহাকে কালজয়ী বলা হয় বা বলা যায় তাহাই সর্বাগ্রে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। সৃজনশীল কাজে নিজেকে নিয়োজিত অথবা সৃজনশীল কাজের কদর করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কণ্ঠশিল্পী, চিত্রকর, অভিনেতা, কবি, লেখক তাহাদের সৃজনশীল কর্ম করিয়া থাকেন। কেহ কেহ প্রশংসিত হন, আবার কেহ অখ্যাতই থাকিয়া যান। আবার কেহ ক্ষণিকের জন্য মানুষের অভিবাদন পাইয়া তাহার পর পর্দার আড়ালে চলিয়া যান; কিন্তু যাহারা এক প্রজন্মে জন্মগ্রহণ করিয়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের অভিবাদন পাইয়া থাকেন, যুগের পর যুগ মানুষ যাহার সৃজনশীল কর্মকে সমাদর করিয়া থাকেন তাহারাই কালজয়ী। সেই অর্থে সন্ধ্যা মুখার্জি নিসন্দেহে উপমহাদেশের এক কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী। দুই বাংলার মানুষের কর্ণে যে শিল্পীর গান সদা অনুরণিত হইয়াছে, তিনি আর কেহ নহেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলকাতার একটি হাসপাতালে প্রয়াত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। পরিপূর্ণ বয়সেই চলিয়া গেলেন তিনি। তবু বাঙালি হূদয়ে এক শূন্যতা সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। ভারতীয় দার্শনিক কবিরের বিখ্যাত রচনায় আছে, জন্মগ্রহণের সময় তুমি কাঁদিয়া উঠিলে। তখন মানুষ আনন্দে হাসিয়াছে। পৃথিবীতে এমন কাজ করো, প্রয়াণকালে তুমি হাসিতে হাসিতে চলিবে, জগত্ কাঁদিতে থাকিবে।’ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জন্য এই বাক্যগুলি সত্যি হইয়া উঠিল। দীর্ঘ ৭৫ বত্সর তিনি সংগীতের মধ্য দিয়া বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সাদামাটা হইলেও সন্ধ্যার সংগীত জগত্ ছিল বৈচিত্রে্য ভরপুর। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, উচ্চাঙ্গ, ঠুমরি, আধুনিক গান, চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক—সংগীতের এই সকল ক্ষেত্রেই সন্ধ্যা ছিলেন লুব্ধকের মতো উজ্জ্বল। শ্যামল মিত্রের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি বিখ্যাত গানের কলি, ‘এ গানে প্রজাপতি পাখায় পাখায় রং ছড়ায়/এ গানে রংধনু তার সাতটি রঙে দোল ঝড়ায়’। সত্যিই উপমহাদেশের আকাশে বাতাসে সন্ধ্যার কণ্ঠের গান রং ছড়াইয়াছে, রামধুন তার রঙের দোল ঝড়াইয়াছে।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের বিশেষ দুর্বলতা রহিয়াছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াইতে তিনি সংগীতকে ব্যবহার করিয়াছিলেন। সমরদাস ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় কলকাতায় গড়িয়া উঠিয়াছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহে নামা হইতে শুরু করিয়া বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পক্ষে সচেতনতা সৃষ্টিতেও সচেষ্ট হইয়াছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য গান রেকর্ড করা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেল হইতে মুক্তি উপলক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু তুমি এলে’র মতো গান করিয়াছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম ২১শে ফেব্র‚য়ারিতে ঢাকার পল্টনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়াছিলেন সন্ধ্যা। সদ্যপ্রয়াত এই কালজয়ী শিল্পীর প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা। সন্ধ্যা সারা জীবনে বহু সম্মানে ভূষিত হইয়াছেন। পাইয়াছেন জাতীয় পুরস্কার, বঙ্গবিভূষণ সম্মাননা। তবে জীবনের একেবারে শেষ প্রান্েত আসিয়া পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করার কেন্দ্রের ডাকে তিনি সাড়া দেন নাই। তিনি শেষ বয়সে এই পুরস্কারের ঘোষণায় অপমান বোধ করিয়াছেন। সন্ধ্যার এই অপমানবোধ বাঙালি জাতিসত্তাকেও আহত করিয়াছে।
সম্প্রতি উপমহাদেশের আরেক কালজয়ী শিল্পী লতা মঙ্গেশকরও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিয়াছেন। তিনিও পরিণত বয়সেই প্রয়াত। বুধবার চলিয়া গিয়াছেন সংগীতশিল্পী বাপ্পি লাহিড়ি। এই সকল মৃতু্যই বাংলা গানের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কোনো মৃতু্যই কাঙ্ক্ষিত নহে, বয়স যতই পরিণত হউক। তাহার উপর যদি সেই মানুষ হন প্রতিভাবান, স্বনামখ্যাত, তাহা হইলে সমাজ অধিক বিচলিত হইয়া পড়ে। সন্ধ্যা, লতার জন্ম হইয়াছিল স্বর্ণযুগে। বয়সেও তাহারা কাছাকাছি। কাকতালীয়ভাবেই চলিয়া গেলেন মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে; কিন্তু ইহাও সত্যি, উপমহাদেশের সংগীত ভুবনে এই নামগুলি ভাস্বর হইয়া থাকিবে।
