এই মশকরা বন্ধ হইবে কবে?

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:০৩

প্রতিদিন রাজধানীর ফুটপাত ও রাস্তার দোকানে প্রায় ৫ লক্ষ অবৈধ বিদ্যুৎ বাতি জ্বলে। একটি বাতি হইতে দিনে গড়ে ২০ টাকা আদায় করা হয়। সেই হিসাবে অবৈধ বিদ্যুত্সংযোগ দিয়া মাসে ৩০ কোটি টাকা হাতাইয়া লইতেছে প্রভাবশালী চক্র। বত্সর শেষে এই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি টাকা। ইহা কেবল রাজধানীর চিত্র। সমগ্র দেশ হিসাবে লইলে এই ধরনের বিদ্যুৎ চুরি হইতে সরকারের লোকসানের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াইয়া যাইবে নিঃসন্দেহে। বিদ্যুৎ বিভাগের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া গণহারে এই বিদ্যুৎ চুরি করা সম্ভব নহে। এইভাবে ব্যবহার হওয়া বিদ্যুৎ শেষ পর্যন্ত সিস্টেম লস হিসাবে চালাইয়া নেওয়া হইতেছে। এই সিস্টেম লস যে একপ্রকার অনিয়ম ও দুর্নীতি তাহা আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিতেছি না। কবি লিখিয়াছেন, ‘ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল,/ গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।’ এইরূপ ছোট্ট ছোট্ট অনিয়ম ও লুটপাট হইতেই বড় বড় অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্ম লইয়া থাকে। তাই বিদ্যুতের এই সিস্টেম লস বা চুরিকে সামান্য বলিবার কোনো অবকাশ নাই।

বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, সিস্টেম লসের পাশাপাশি ভোক্তাদের কনজাম্পশন বেশি দেখানো হইতেছে। এই সকল লস নিয়মিত ভোক্তার ঘাড়ের উপর চাপাইয়া সমন্বয় করা হইতেছে। এই দেশের ট্যাক্সপেয়ার ও সাধারণ গ্রাহকরা নিরীহই বটে। ইহা লইয়া তাহারা তেমন একটা উচ্চবাচ্চ করেন না। কেননা তাহাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব বিদ্যমান; কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হইল, অবৈধ সংযোগের দায় বৈধ গ্রাহকরা লইবেন কেন? ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এই অবৈধ সংযোগ বন্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে বটে; কিন্তু কিছু কিছু অসাধু লোক ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকিয়া এই রকম জাতীয়বিরোধী অপতত্পরতা চালাইয়া যাইতেছে। এখান হইতে সরকার যে রাজস্ব হারাইতেছে তাহা দিয়া বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের আরো উন্নয়ন সাধন করা যাইত।

এইদিকে সরকারি অফিসগুলিতে দেখা যায়, নানাভাবে বিদ্যুতের অপচয় করা হইতেছে। বৈদ্যুতিক ফ্যান-বাতি ঠিকমতো অন-অফ করা হইতেছে না। সিটি করপোরেশনের বাতিগুলি অনেক সময় দিনের বেলায়ও জ্বলিতে দেখা যায়। তাই সরকারি অফিসের বিদ্যুতের বিল নিয়মিত পরিশোধ করিয়া পূর্বে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। শুধু বিদ্যুৎ নহে, পানি, গ্যাসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় সিস্টেম লস বা অপচয় একটি সাধারণ ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সরকার বিভিন্ন চোখ জুড়ানো অবকাঠামো নির্মাণ করিয়া চলিয়াছে; কিন্তু এই চুরি-অপচয় বন্ধের প্রতি মনোনিবেশ করিতেছেন না কেন? অবশ্য সরকারপ্রধান মাঝেমধ্যে জনগণের উদ্দেশে বলিয়া থাকেন, আপনারা পানির কল খুলিয়া রাখিবেন না; কিন্তু সেই নির্দেশ খুব কমই মানা হয়!

যেইভাবে সরকারি সম্পদের অপচয় চলিতেছে, তাহাতে রাজাও একদিন ফকির হইয়া যাইবেন। হইয়া পড়িবেন কপর্দকহীন। উন্নয়নশীল বিশ্বের ইহা এক বড় সমস্যা। সরকারপ্রধান বলিতেছেন, আর নূতন রাস্তা করিবেন না। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই এলাকায় ১৪টি রাস্তা তৈরিরও চিঠি দেওয়া হইতেছে। এত রাস্তা বানানো হইতেছে; কিন্তু তাহা যথাযথভাবে মেরামত করা হইতেছে না। ইহাও একধরনের সরকারি অর্থের অপচয়। কখনো কখনো আবার বলা হয়, বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাসের অবৈধ সংযোগগুলি রেগুলাইজ করা হইবে। যাহারা সেই সকল এলাকায় বসবাস করেন, তাহারা সরকারি এই সিদ্ধান্ত শুনিয়া হাসেন। কারণ ইহার চাইতে বড় মশকরা আর কী হইতে পারে? যখন লাইন অবৈধ থাকে, তখন নিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হয়। এখন রেগুলাইজ করিবার নামে আরেক দফা অর্থ আদায় করা হইবে। পরিশেষে আমরা আশা করি, বিদ্যুত্সহ গ্যাস, পানি ও অন্যান্য সরকারি সেবার অবৈধ সংযোগগুলি অবিলম্বে বন্ধ করা হইবে।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন