এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নামে পরিবেশ লইয়া কাজ করা একটি সংস্থা বুধবার একটি ভাচুর্য়াল আলোচনার মাধ্যমে ‘একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার’ নিষিদ্ধের আহ্বান জানাইয়াছে। বিষয়টির প্রতি আমাদের দৃষ্টি পড়ার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে। তাহাদের এই দাবি যৌক্তিক বলিয়াই মনে হইয়াছে। যে কোনো ব্যাবহারিক জিনিস একবার মাত্র ব্যবহারের কিছু সুবিধা রহিয়াছে। উহা বহন করিয়া ফিরিতে হয় না, বহুলোক ব্যবহারের ফলে রোগসংক্রমণের ঝুঁকি থাকে না, প্লাস্টিক পণ্যের মূল্য অপেক্ষাকৃত ঢের কম ইত্যাদি কারণে প্লাস্টিক জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু ঐ কিছু সুবিধা ভোগ করিতে গিয়া এখন মানবজাতিসহ বিশ্বের প্রাণবৈচিত্র্য এক ভয়াবহ হুমকির মধ্যে পড়িয়াছে। পরিস্হিতি দাঁড়াইয়াছে, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’।
প্লাস্টিকের ব্যবহার শুরু হইয়াছিল ‘বিন্দু’ দিয়া, চার দশকে তাহাই ‘মহাসিন্ধু’তে পরিণত হইয়াছে। প্রস্তর-ব্রোঞ্জ-লৌহ সভ্যতা পার করিয়া আমরা অত্যাধুনিক ‘প্লাস্টিক’ সভ্যতায় পা রাখিয়াছি। সাধারণ জ্ঞানে যদি প্রশ্ন করা হয়, জৈব-অজৈব নির্বিশেষে সাগর-মহাসাগরের নিচে বিচরণশীল সর্বাধিক দৃশ্যমান বস্ত্তর নাম কী? উত্তরে হয়তো বলা হইবে মত্স্যজাতীয় প্রাণীর কথা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, এমন উত্তরকে এখন আর সম্পূর্ণ ‘সঠিক’ বলা যাইবে না। নূতন উত্তর হইবে—প্লাস্টিক! এমনকি প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়াছে গর্ভস্হ মানবশিশুর প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলে।
বিগত চার দশক ধরিয়া মানুষ উজাড় করিয়া উদারহস্তে যেভাবে প্লাস্টিক ব্যবহার করিতেছে, তাহারই বাইপ্রডাক্ট এখন সমুদ্রের নিচে ক্রমশ রাজত্ব কায়েম করিতেছে। গ্রিনল্যান্ড হইতে প্রশান্ত মহাসাগর, ব্রাজিল হইতে দক্ষিণ আফ্রিকার মহাসাগরের বিভিন্ন অংশে ভাসিয়া চলিতেছে এই প্লাস্টিকের আবর্জনা। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, প্রশান্ত মহাসাগরে বিশাল এক এলাকা জুড়িয়া বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া জমা হইয়া আসিতেছে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য। মহাসাগরসমূহের ওপরে এক পাতলা প্লাস্টিকের চাদর তৈরি হইয়াছে। সূর্য কিরণের প্রভাব ও দিনের পর দিন ঢেউয়ের ধাক্কায় এসব বর্জ্য প্লাস্টিক ভাঙিয়া টুকরো টুকরো হইয়া ক্ষুদ্র টুকরায় পরিণত হয়। আর বিপদ এইখানেই। এই সকল প্লাস্টিকের অধিকাংশই ‘মাইক্রো প্লাস্টিক’ এবং তাহারা পাঁচ মিলিমিটার হইতেও ক্ষুদ্র। এই সকল খুদে প্লাস্টিককেই বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী খাবার হিসাবে গ্রহণ করিতেছে। তাহা ছাড়া, সাগরতলায় জমিয়া উঠা প্লাস্টিক বর্জে্যর ভিতরেই ডিম পাড়িতে শুরু করিয়াছে সামুদ্রিক প্রাণীরা। প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো কোনো এলাকায় ৯ শতাংশের বেশি সামুদ্রিক প্রাণীর পাকস্হলীতে প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া গিয়াছে। প্রতি বত্সর জলজ প্রাণিকুল যে পরিমাণ বর্জ্য প্লাস্টিকের কণা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে, তাহার পরিমাণ ২৪ হাজার টনের অধিক। প্লাস্টিক বর্জে্যর কারণে সাগর মহাসাগরে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে পা বাড়াইয়াছে। শুধু সমুদ্র নহে, নদী-নালা-খাল সর্বত্র প্লাস্টিকের দূষণ চলিতেছে।
বর্জ্য প্লাস্টিক হইতে নির্গত বিষাক্ত পদার্থ সার্বিকভাবে সমুদ্রের প্রাণীর পরিবেশ প্রতিবেশের শৃঙ্খলা ভাঙিয়া ফেলিতেছে। প্লাস্টিকের বিভাজিত অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ ইতিমধ্যেই প্রকৃতপক্ষে কতটা ক্ষতি করিয়া ফেলিয়াছে, তাহা এখনো কল্পনার বাহিরে। তবে দূষণের ফলে সমুদ্রের প্রাণীদের ঘোর দুর্দিন যে আমাদের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হইয়া দেখা দিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, নীরবে-নিভৃতে প্লাস্টিক সভ্যতা আমাদের ভয়াবহ পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে। লক্ষ করিলেই দেখা যাইবে, প্লাস্টিকের অতিমাত্রায় ব্যবহার হইয়া থাকে সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে। ফলে উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠান শুধু নহে, দেশের সাধারণ মানুষও মনে করে প্লাস্টিক এখনই নিয়ন্ত্রণের সময়। এই ব্যাপারে ব্যক্তিপর্যায় হইতে শুরু করিয়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন। প্রয়োজন আরো ব্যাপক গবেষণার।
