গোটা বিশ্বের নজর এখন রাশিয়া-ইউক্রেনের দিকে। ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোর উত্তেজনা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। প্রতি দিনই নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে চলমান উত্তেজনা। কখনো যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা আবার কখনো আলোচনার মাধ্যমে পরিস্হিতি ঠান্ডা হওয়ার আশা। বড় কোনো যুদ্ধের পরিস্থিতি সেখানে যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য বিশ্বের অনেক নেতারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। রাশিয়া বলছে, তারা যুদ্ধ চায় না।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধ বাঁধাতে রাশিয়া মরিয়া হয়ে প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। একে অপরের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়াচ্ছে এবং একে অন্যের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলছে। কিন্তু কেউই যুদ্ধপ্রস্তুতি থেকে পিছপা হচ্ছে না। যুদ্ধের জন্য সৈন্য এবং অস্ত্র দু-পক্ষই সমানে বাড়িয়ে চলেছে। আমেরিকার দাবি রাশিয়া ৭০ শতাংশ যুদ্ধের প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। সেই সঙ্গে আমেরিকা বলছে, যুদ্ধ বাঁধলে ৫০ হাজার বেসামরিক নাগরিক মারা যেতে পারে এবং বাস্তুচ্যুত হতে পারে লাখ লাখ মানুষ। সবকিছু মিলে গোটা ইউরোপ জুড়ে টালমাটাল অবস্থা বিরাজমান। যুদ্ধ বেঁধে গেলে পরিস্থিতি ভয়ংকর হবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই পরাশক্তির দেশ।
দুই দেশেরই মিত্র দেশ রয়েছে। রাশিয়ার মিত্ররা রাশিয়ার সঙ্গে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক হয়ে যুদ্ধ করতে প্রস্ত্তত রয়েছে। ইতিমধ্যে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো হুঁশিয়ার করে দিয়েছে, রাশিয়ায় হামলা হলে তারা বসে থাকবে না, মস্কোর পক্ষে তারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। তবে, বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞরাই বলছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা নেই। কারণ ইতিপূর্বের দুটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে সবাই বিস্তর অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। যুদ্ধে যারা পরাজয় বরণ করে, তাদের যেমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, তেমন বিজয়ীদেরও ক্ষয়-ক্ষতি হয়। একটু কম আর বেশি। তাই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জন্য আগ্রহী হলেও ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশই যুদ্ধ চাইছে না। তাছাড়া রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে যে যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা তৈরি করছে, এর পেছনে যুদ্ধের থেকে বেশি রয়েছে কৌশলগত নানা কারণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইউরোপে ন্যাটোর ক্ষমতা বিস্তার করা ঠেকানো।
করোনা অতিমারিতে পুরো বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তার ওপর যদি যুদ্ধ বাঁধে তাহলে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অবস্হা হবে। এমতাবস্হায় এই উত্তেজনা কমাতে অস্ত্র ছাড়া সমাধানের পথে যেতে হবে। প্রথমে দু-পক্ষকেই শান্ত হতে হবে এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে— এমন যাবতীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। তারপর যুদ্ধের এই উত্তেজনা থেকে বের হয়ে বিকল্প ব্যবস্হা গ্রহণ করতে হবে। আর সেটি হবে অবশ্যই সমঝোতা এবং শান্িতপূর্ণ আলোচনা। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ সেটির উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু রাশিয়া যা চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সেটি দিতে বা মানতে নারাজ। যতটুকু জানা যায়, রাশিয়া চায় না ইউক্রেন ন্যাটো জোটের অন্তভুর্ক্ত হোক। রাশিয়া চায় ইউরোপে ন্যাটোর সামরিক মহড়া এবং অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া বন্ধ হোক। রাশিয়া আরো চায় মিনস্ক-২ চুক্তির বাস্তবায়ন, যেটি এই পরিস্হিতির উত্সমূল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা যদি এই চুক্তিটি পর্যালোচনা করে ও সময়োপযোগী করে তোলার চেষ্টা করে, সেক্ষেত্রে উপস্হিত সংকট সমাধানের একটি পথ উঠে আসতে পারে। এছাড়াও কূটনৈতিক আলোচনা বাড়াতে হবে।
কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করে ইউক্রেন নিয়ে চলমান অস্হিরতার সমাধান সম্ভব। উভয় পক্ষেরই সমঝোতার মনোভাব থাকতে হবে। পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত, তবে নিয়ন্ত্রণে। তাই যুদ্ধের দিকে না গিয়ে শান্তি ও সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। ইউক্রেনকে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বলয় থেকে দূরে থাকতে হবে। রাশিয়ার উচিত হবে ইউক্রেনকে নিজ বলয়ভুক্ত করার চেষ্টা না করা। আর পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত হবে ইউক্রেনকে ন্যাটোর ভেতরে টেনে না আনা। ইউক্রেন পরিস্হিতি শেষপর্যন্ত যদি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে পুরো ইউরোপ ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হবে। এমনকি পুরো পৃথিবীও। অসংখ্য বেসামরিক জনগণের ক্ষতির পাশাপাশি সব থেকে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে শিশু ও নারী। তাই যে কোনো মূল্যে অস্ত্র ব্যতীত এই সংকট নিরসনের পথ বের করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
