কোভিড ১৯-এর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে শুরু হয়েছে বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’। শুরু থেকেই মেলা বেশ জমজমাট। প্রতি বছর মেলা উপলক্ষ্যে তরুণ লেখকদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বইও প্রকাশিত হয়ে আসছে। পাঠকদের মধ্যে তরুণ লেখকদের বইয়ের আগ্রহ উল্লেখ করার মতো।
সত্যিকার অর্থে বই এমনই এক জ্ঞানের ভান্ডার, যার মাধ্যমে মানুষের মননশীল, চিন্তাশীল, সৃজনশীল চিন্তার যাবতীয় সূচনা হতে পারে। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের পাঠ অভ্যাসের তথ্য পাওয়া যায়। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হলে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে হবে। এজন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বই মনের খোরাক মেটায়। বই পড়ে জ্ঞানার্জন করে মানুষ সেই জ্ঞানকে সামগ্রিকভাবে কাজে লাগাতে পারে।
জ্ঞানীরা সব সময় বলেন, জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে, যে সব গুণাবলি বা দক্ষতার প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বই পড়া। বিশ্বের সফলতম মানুষদের মধ্যে জ্ঞানের প্রতি যে তৃষ্ণা রয়েছে তা মেটানোর মাধ্যমও বই পড়া। বই পড়ার প্রধান উপকারিতা হচ্ছে মানসিক সৌন্দর্যের সমৃদ্ধি অর্জন। বই পড়ার মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিয়মিত ব্যায়াম ঘটে। বই পড়ার অন্যতম মজা হচ্ছে, বই পড়ে একজন মানুষ মুহূর্তে অজানা এক রাজ্যে হারিয়ে যেতে পারে। বই মানসিক চাপ কমিয়ে প্রশান্তি ফিরিয়ে দিতে সহায়ক মাধ্যম। বেশি বেশি বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের শব্দের ভান্ডারের নতুন শব্দ যুক্ত হতে থাকে। মানুষকে আত্মবিশ্বাস জোগাতে, নতুন ভাষা শিখতেও বই পড়ার বিকল্প নেই।
বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ এক নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করতে পারে। প্রবাদ আছে, ‘পড়তে পড়তে পাঠক আর লিখতে লিখতে লেখক’। একজন ভালো পাঠক চাইলে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন কোনো জ্ঞানের কথা বই আকারে লিখতে পারেন। কারণ, নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষের পাঠের আগ্রহ রয়েছে। যে বিষয় নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে, সেই বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি জন্য বই-ই একমাত্র নিয়ামক। বই পড়ার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ তার অন্তর্দৃষ্টির একটি সুগঠিত পম্হা এবং ভবিষ্যতের উত্তম কর্ম নির্ণয় করতে সক্ষম হন। বই পড়ার মধ্য দিয়ে কল্পনাশক্তির পাশাপাশি সৃজনশীলতারও উন্মেষ ঘটে। বই আত্মোন্নতিতে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখে। বই পড়ার মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ স্হাপন করা যায়। যারা বই পড়ে না, তারা অনেকেই অনেক বিষয়েই সচেতন নয়। তাই আত্মোন্নয়ন ঘটাতে হলে কিছুতেই তাই বইয়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানো চলবে না। সব সময় বইয়ের সঙ্গেই থাকতে হবে, বই পড়তে হবে।
বাঙালির একুশে বইমেলার অন্যতম প্রাণ হলো তারুণ্য। প্রতি বছর তরুণ লেখকরা মাতিয়ে রাখে গোটা বইমেলা। তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার বিখ্যাত ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় তো বলেছেনই, ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্হান’। সত্য যে, নতুনের আগমনে সবকিছু সুন্দর ও প্রাণময় হয়ে ওঠে। তাই নতুনকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন লেখকের চিন্তাশক্তি সম্পর্কে জানতে তাদের লেখা বই পাঠ করে উত্সাহ দিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের বইয়ের সমালোচনা করতে হবে। নতুন লেখকের আবেগের জায়গাটি চিহ্নিত করে সেভাবে তাদের পরামর্শ দিতে হবে প্রবীণ লেখকদের। কেননা, একজন পাঠক যে বইটি পড়ছেন, সেটি মূলত ঐ বইয়ের লেখকের বিশেষ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা-চিন্তা থেকেই লেখা। প্রত্যাশা করি, আমাদের বইমেলা তরুণ লেখকদের সঙ্গী করেই এগিয়ে যাবে। আমরা বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে বসবাস করছি। ফলে দেখা যায়, আগে যেখানে মানুষ সবসময় বই পাঠে মনোযোগী হতে পারত, এখন বইয়ের প্রতি মানুষের তেমন একটা ঝোঁক নেই। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ বইবিমুখ হয়ে পড়েছে। এ অবস্হা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বইয়ের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। বই পড়ার মাধ্যমে নিজেদের বিকশিত করতে পারলেই ভবিষ্যতে আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
লেখক: শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
