করোনা ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীতে ছড়াইয়া যাইবার পূর্বে ২০২০ সালের প্রারম্ভিকে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থায় ঝিমানিভাব আসিয়াছিল। তাহার পর কোভিড আসিয়া গত দুই বৎসরে একের পর এক লাগামহীন ঝড় তুলিয়াছে। দেশে দেশে কোভিড ঠেকাইতে যেই সকল বজ্র আঁটুনির ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে, তাহাতে কোভিডের দুর্মর প্রবাহ যেমন আটকানো যায় নাই, তেমনি অর্থনৈতিক পতনও দুর্বার গতিতে ঘটিয়াছে এবং এখনো তাহা অব্যাহত রহিয়াছে। গত দুই বৎসরে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আয়রোজগার কমিয়া গিয়াছে। এখন করোনার সংক্রমণ কিছুটা কম হওয়ায় এবং দেশে দেশে টিকা নেওয়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়া আসিতেছে ক্রমশ; কিন্তু নূতন চাহিদার সহিত সরবরাহ তাল মিলাইতে পারিতেছে না। ফলে জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়াই চলিতেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, গত ৪০ বৎসরের মধ্যে যাহা সর্বোচ্চ। এই দিকে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে লন্ডনে বিক্ষোভ করিতেছে অসংখ্য মানুষ। মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ লইয়া নূতন বৎসরে পা রাখিয়াছে ব্রিটেন। অন্যদিকে ইউরোজোনে, অর্থাৎ যেই ১৯টি দেশে ইউরো মুদ্রা ব্যবহার করা হয়, সেই সকল দেশে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৯৭ সালে ইউরো চালু হইবার পর ইহাই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নহে, এশিয়ার দেশগুলির অবস্থাও শোচনীয়। বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানে যেইখানে ১৯৮০ দশকের মন্দার পর ধারাবাহিকভাবে জিনিসপত্রের মূল্য কমিয়া আসিতেছিল—অর্থাত্ মূল্যস্ফীতি ছিল ঋণাত্মক, সেই দেশেও গত ডিসেম্বরে প্রায় ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হইয়াছে! দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তানে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩ শতাংশ। সেইখানে খাদ্যপণ্যের মূল্য ১৭ শতাংশ বাড়িয়াছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিকে তাহাদের আয়ের অর্ধেক খরচ করিতে হইতেছে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের পিছনে। ভারতেও টানা কয়েক মাস ধরিয়া মূল্যস্ফীতির হার বাড়িয়া চলিতেছে—সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত বুধবার জানাইয়াছে, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) চলতি বৎসরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
দেখা যাইতেছে, চাহিদা-সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটানো সর্বশেষ ডেলটা ও ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কারণে সমগ্র দুনিয়ায় সকলকে কমবেশি ধকল পোহাইতে হইতেছে। জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় একটি কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত তেল) দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯৫ ডলারে পৌঁছাইয়া গিয়াছে। মাত্র কয়েক মাস পূর্বে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ ডলার পার হইবার পর বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হইয়াছিল। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত সাত বৎসরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠিয়া গিয়াছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উত্পাদকারী দেশ চীনে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়াছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে মহামারিতে চীনের বাজারেও খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হইয়াছে। চীনের অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাইলে তাহার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে পড়িবেই।
প্রশ্ন হইল—কত দিন চলিবে এই পরিস্থিতি? অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করিতেছেন, শিগ্গিরই এই পরিস্থিতি কাটিবে না। এইদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি গৃহস্থালির বাজেটকে চাপে ফালাইতেছে এবং প্রবৃদ্ধির উপর প্রভাব ফালাইতেছে। পূর্বে যেমন শহরগুলির তুলনায় গ্রামাঞ্চলে খাদ্যপণ্যের দাম তুলনামূলক কম ছিল, এখন আমাদের গ্রামগুলিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়াছে ব্যাপক হারে। এই অবস্থায় আমাদের দুইটি জিনিস প্রয়োজন—এক. যথেষ্ট কর্মসংস্থান; দুই. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দুইটি চাহিদাই মানুষের অন্নবস্ত্রের প্রশ্নের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সহজ কথায়, কর্মসংস্থানের জন্য গতিশীল অর্থব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও মূল্যস্ফীতি না ঘটাইয়া উপায় থাকে না। কারণ, মূল্যস্ফীতি নিশ্চিতভাবেই অর্থব্যবস্থার ক্ষতি করিলেও হাতে অর্থ থাকিলে বর্ধিত মূল্যস্তরের সহিত লড়াই করিবার কাজটি মানুষের পক্ষে সহজতর হয়। আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকিলে বাজারে চাহিদা বাড়িবে কী করিয়া? আমাদের জন্য আরো আশঙ্কার হইল—ট্রিলিয়ন ডলার বাজেটকারী ধনী দেশগুলি এই খারাপ দশা হইতে যত সহজে বাহির হইয়া আসিতে পারিবে, আমাদের জন্য ইহার সমাধান তত সহজ নহে। আর এইখানেই প্রয়োজন বিশেষ ম্যানেজমেন্ট। বিশেষ ব্যবস্থাপনার হালনাগাদ সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে হইবে। ইহা এক অতি কঠিন পরীক্ষা।
