ভেষজ

চিরায়ত চিকিত্সায় ওষুধি গাছ

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৩৮

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

আমরা ছোটবেলায় দেখেছি গ্রামবাংলায় চিরায়ত সেই ভেষজ ওষুধের চিকিত্সা। মানুষ, গবাদি পশু, এমনকি হাঁস-মুরগি পর্যন্তও ভেষজ চিকিত্সা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সেটাকে বলা হতো কবিরাজি চিকিত্সা। বাড়িতে কারো পেটের ব্যথা হলে কাঁচা বেল, আমাশয় হলে এঁটে বা বিচি কলা সেসঙ্গে খারাজরা গাছের ছাল কিংবা পাতা দিয়ে বিশেষ ধরনের শরবত বানিয়ে খাওয়ালে তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যেতো। মাঠে কাজ করতে করতে কোথাও একটু কেটে কিংবা ছিলে গেলে সেখানে তাত্ক্ষণিক কচু গাছের পাতাসমেত ডাল কেটে তা থেকে কচু ডগার ফেনাযুক্ত রস লাগিয়ে দিলেই সে জায়গা তাত্ক্ষণিক একটা কামড় দিয়ে এন্টিবায়োটিকের কাজ করতো। সঙ্গে সঙ্গে দুর্বা ঘাস চিবিয়ে কিংবা থানকুনি পাতা কচলিয়ে তার রস ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে রাখলে খুব সহজেই ভালো হয়ে যেতো।

   এখানে থানকুনি গাছের ভেষজ গুণ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো। থানকুনি এক ধরনের ছোট বর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ। গ্রামাঞ্চলে থানকুনি পাতার ব্যবহার আদি আমল থেকেই চলে আসছে। ছোট্ট কিন্তু গোলাকৃতির এ পাতার মধ্যে রয়েছে অনেক ভেষজ গুণ। এ পাতার রস রোগ নিরাময়ে অতুলনীয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, উত্তর অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি এবং এশিয়ার অন্যান্য প্রান্তে এ অতি প্রয়োজনীয় উদ্ভিদটি পাওয়া যায়। এর গুণগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিয়মিত সপ্তাহে অন্তত ২-৩ দিন খেলে চুলপড়া বন্ধ হয়, পুষ্টির ঘাটতি দূর হয়, শরীরের টক্সিক উপাদান বেরিয়ে যায়, ব্যথা উপশম হয়, হজমের উন্নতি ঘটে, বদহজম ও গ্যাস বন্ধ করে, ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এমন নিরাময়ের কারণ হলো এতে অ্যামাইনো এসিড, বিটা ক্যারোটিন, ফ্যাটি এসিড, ফাইটোক্যামিক্যাল ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিদ্যমান।

 প্রকৃতিতে এমনিভাবে ভেষজ গুণসম্পন্ন আরো হাজারো গাছ-গাছড়া রয়েছে যাদের আলাদা আলাদা ভেষজ গুণ বিদ্যমান। এখন এগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। তেমনি কয়েকটি ভেষজ উদ্ভিদের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো। যেমন- দণ্ডকলস, হাতিশুড়, বিষকাঁটালী, অগ্নিশ্বর, ভেরেণ্ডা, চিকরাশি, পান, শিয়ালমুর্তা, জয়ত্রী, আপাং, চালধোয়া, শ্বেতচন্দন, কল্পনাদ, কষ্টকারী, রক্তজবা, ওলটকম্বল, ধুতরা, বাসক, কর্পূর, আগর, রিঠা, পানবিলাস, নিশিন্দা, সর্পগন্ধা, অর্জুন, পুঁদিনা, তুলসি, আমলকি, নয়নতারা, রক্তকরবী, যজ্ঞডুমুর, গন্ধবাদালী, টগর, জয়তন, বেত, মহুয়া, মেহেদি, কুমারিলতা, বহেড়া, হরিতকী, দাদমর্দন, গিলা, গুলঞ্চ, ঝুমকোলতা, জয়ন্তী, তেলমাখানা, কলকে, সন্ধ্যামালতী ইত্যাদি।

 এদের কোনোটি স্থানীয় কিংবা কোনোটি প্রচলিত বা কোনোটি অপ্রচলিত নামেও কাজের জন্য পরিচিত। তবে এদের প্রত্যেকটি বাংলাদেশের মাটি, বায়ু ও জলে উত্পাদন উপযোগী এবং সারাদেশে সারাবছরই কোনো না কোনোটি পাওয়া যায়। এমন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ ওষুধি গাছের নাম হলো স্টেভিয়া। এটি চিনিগাছ হিসেবেও পরিচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি চিনির চেয়ে প্রায় তিনশ গুণ বেশি মিষ্টি। স্টেভিয়ার একটি বিশেষত্ব হলো এ মিষ্টি গাছটির পাতার রস মিষ্টি হলেও তা ডায়াবেটিস রোগীরাও খেতে পারে। এ গাছের পাতা দিয়ে চা, সেমাই, হালুয়া, মিষ্টি, পায়েস ইত্যাদি তৈরি করা যায়। এভাবে হয়তো আরো অনেক ওষুধি গাছের আলাদা আলাদা গুণাগুণ বর্ণনা করা যাবে। 

ঠিক এভাবে ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এগুলো চিকিত্সা একদিকে যেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিহীন এবং অন্যদিকে তেমনি কার্যকর এবং খরচও অনেক কম। সারাদেশের সবধরনের শ্রেণিপেশার মানুষ এসব চিকিত্সা সহজেই গ্রহণ করতে পারে। তবে এসব ভেষজ গাছ-গাছালি আবাদের জন্য উদ্যোগীদের নার্সারি স্থাপন করতে হবে যাতে সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু এসব চিকিত্সার নামে যাতে যেসব অপচিকিত্সা চলছে সেইগুলোর দিকে তীক্ষ নজর রাখতে হবে।         

লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়