আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম
রাস্তাজুড়ে বাস, রিকশা, কার, হিউম্যান হলারসহ নানা বাহন। ধারঘেঁষে হাত দেড়েক ফাঁকা জায়গা। ড্রেনের কারণে কোথাও কোথাও আরো সংকুচিত। এটুকুর মধ্যেই চলছে মোটরসাইকেল। ‘ওস্তাদ, বাঁয়ে মোটরসাইকেল’ সহকারীর (হেলপার) এ সতর্কবাণী বাসচালকের কানে না পৌঁছাতেই ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক মোটরসাইকেল। রাজপথ থেকে অলিগলি, ঢাকার সব সড়কে একই চিত্র।
গণপরিবহনের স্বল্পতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, যানজটের ভোগান্তি এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা থাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মোটরসাইকেল। প্রতিদিনই বাড়ছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ‘ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি হাঁটার গতির চেয়েও কম।’ অপ্রতুল সড়কে যানবাহনের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি, তাই যানজট লেগেই থাকে। রাজধানীতে যানজট থাকার কারণে অনেক সময় তীব্র হর্ন দিয়ে দুরন্ত গতিতে ফুটপাতের ওপর দিয়েই চলাচল করে মোটরসাইকেল। কোনো কোনো তরুণ চালক আঁকাবাঁকা করে দ্রুতগতিতে বাইক চালায়। আবার কেউ চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত পাড়ি জমায় ঝুঁকি নিয়ে। এভাবে চলাচলের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে বাস ও মোটরবাইকের দুর্ঘটনা। এমনকি ট্রাফিক সিগন্যালও উপেক্ষা করে দ্রুত বেরিয়ে যেতে দেখা যায় কখনো বাইকচালককে।
মোটরযান অধ্যাদেশ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী, রাস্তায় বা জনগণের চলাচলের জায়গায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাকে জেল, আর্থিক জরিমানা অথবা জেল ও জরিমানা উভয়ই করতে পারবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। অথচ বাইকচালক এমন অ্যাক্টের কোনো পরোয়াই করেন না।
২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে শুধু রাজধানীতেই ৩২ হাজার ৫৬২টি নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংখ্যাটির গড় হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন ২৭১টি, প্রতি মাসে ৮ হাজার ১৪০টি নতুন মোটরসাইকেল নামছে ঢাকার রাস্তায়। ২০১৮-তে সারা দেশে নিবন্ধন পেয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৪টি মোটরসাইকেল। সে হিসাবে দেশে প্রতিদিন ১ হাজার ৫৫টি নতুন মোটরসাইকেল রাস্তায় নেমেছে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ঢাকা মহানগরে বিভিন্ন ধরনের মোট ৫৬ হাজার ২৫১টি যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাত্ এ সময়ে রাজধানীর সড়কপথে দৈনিক ৪৬৮টি নতুন যানবাহন যোগ হয়েছে। নিবন্ধন পাওয়া যানবাহনের সিংহভাগই মোটরসাইকেল। রাজধানীর সড়কগুলোতে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে এর ১০গুণ বেশি যানবাহন চলে। যার অধিকাংশ এখন মোটরসাইকেল দখল করে নিয়েছে।
হঠাত্ করে মোটরবাইকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী? ঢাকায় মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোটরসাইকেল সেবা হয়ে উঠেছে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় মোটরসাইকেল পরিষেবা। মূলত কম পয়সায় দ্রুত যাতায়াত তার মধ্যে ডিসকাউন্ট সুবিধার কারণে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল রাইড পরিষেবা। তাছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তায় কয়েকটি সেফটি ফিচার যুক্ত করায় মোটরসাইকেল রাইডে আগ্রহী হচ্ছেন নারীরাও। অ্যাপভিত্তিক রাইডের মাধ্যমে বাইক ডাকলে বাস ভাড়া থেকে খরচ একটু বেশি পড়ে, তবু মানুষ দিন দিন ঝুঁকে পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মোটরসাইকেলের মাধ্যমে দ্রুত যানজট ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। আর একদম বাসার গেট পর্যন্ত। এ সুবিধা বাস কিংবা অন্য পাবলিক পরিবহনে সম্ভব নয়। অন্যদিকে এই মোটরসাইকেল যানজটের মধ্যে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনেক তরুণের জন্য অর্থ আয়েরও উত্স হয়ে উঠেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেকেই প্রায় প্রতিদিনই অফিসে যাওয়া-আসার পথে এই রাইড সেবা দিয়ে থাকেন। এতে একদিকে যেমন তার বাইক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উঠে আসে, তেমনি ছুটির দিনে অবসরে কয়েক-ঘণ্টা এই সার্ভিসের মাধ্যমে তার পকেট খরচও এসে যায়। তাছাড়া এখন অনেকেই ফ্রিল্যান্সার রাইড সার্ভিস দিচ্ছে।
সময়ের চাহিদা, মানুষের প্রয়োজনে সমাজের যে পরিবর্ধন, তা অস্বীকার করা বা রোধ করার মতো বোকামি আর কিছু হতে পারে না। বরং একে সাধুবাদ দিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে তা সমাধানের উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সর্বোপরি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পথ চলতে হবে। জীবনকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে একটু সচেতনতাই যথেষ্ট। একটু সময় বাঁচানোর প্রতিযোগিতায়, জীবন নামের মূল্যবান সম্পদকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না, কারণ একটি জীবনের সঙ্গে জড়িত পরিবার, সমাজ তথা অনেক জীবন।
ঢাকা
