ফুটপাতের কাপড় ব্যবসায়ী, ফল বিক্রেতা, হকার, রিকশা-ভ্যানচালক ও ভিক্ষুকসহ শ্রমজীবীদের টার্গেট করে ঋণ দেওয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে পাঁচ মাসে ৫০ লাখের বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছে প্রতারক একটি চক্র। ওই প্রতারক চক্রের প্রধান অভিযুক্ত ফয়েজ উল্লাহ। মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।
র্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, গত বছর ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন ফয়েজ উল্লাহ। তবে এই সমিতির নাম বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে শুরু করেন প্রতারণা। প্রতারণার জন্য খোলা এই ভুয়া সমিতির সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ নিজেই এবং সাধারণ সম্পাদক তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম। সমিতির সহসভাপতি ছিলেন তার বন্ধু সিরাজুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক তার শ্যালক আলাউদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ ছেলে আরিফ হোসেন এবং তার আরও এক বন্ধু মো. জামিল হোসেন ওয়াদুদ ছিলেন সদস্য। পারিবারিকভাবে নিম্ন আয়ের ও শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল এই চক্রটি।
এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী থানার মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে প্রতারক ফয়েজ উল্লাহসহ (৫০) তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪। গ্রেফতার বাকি সদস্যরা হলেন-আফরিন আক্তার (২৪) ও মোছা. তাসলিমা বেগম (৩৩)। এ সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
মোজাম্মেল হক বলেন বলেন, শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড-এর নাম পরিবর্তন করে ভুয়া সমিতির ২০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে ৩০০ জন সদস্য রয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে আমরা জেনেছি৷ এছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের কোনো রক্ষিত জামানত নেই।
ভোলার স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন ফয়েজ উল্লাহ। পরে ১৯৯২ সালে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসেন সে। মিরপুরের ১৪ নম্বরে শুরু করেন কনস্ট্রাকশনের কাজ। এরপর ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কাফরুলের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড অফিসার পদে চাকরি করেন সে।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারণার কৌশল হিসেবে সদস্য সংগ্রহ করা হতো। এই চক্রের মাঠ পর্যায়ের কর্মীর মাধ্যমে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, সেলুনের কর্মচারী, মনোহারী ও ফুটপাতের দোকানদার, গৃহকর্মী ও নিম্নআয়ের মানুষদের টার্গেট করে ঋণ দেওয়া ও সঞ্চয়ের নামে তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। পরে তারা ভুক্তভোগীদের তথ্য সংগ্রহ করে নানান কৌশলে ভুলিয়ে প্রতারক চক্রের অফিস কার্যালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে।
তিনি বলেন, ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ প্রতিদিন আনুমানিক ৩০০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করেন। পরে শ্রমজীবী মানুষদের ভুল বুঝিয়ে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প প্রচার করে।
তিনি আরও বলেন, প্রতারক ফয়েজ উল্লাহ ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে অল্প সময়ে ঋণ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’-এ সঞ্চয় করতে আগ্রহী করে আসছিলো। ভুক্তভোগীদের বলা হতো ১০-১৫ দিন ঠিকমত নির্দিষ্ট হারে সঞ্চয় প্রদান করলে তাদেরকে ঋণ দেওয়া হবে। যাতে করে তারা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে পারেন। কিন্তু ভুক্তভোগীদের দু’একজনকে ঋণ দিলেও কেউ সঞ্চয় থেকে ঋণ পেতো না।
র্যাব জানায়, এ কোম্পানির কিছু সদস্য দৈনিক ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সঞ্চয়/ডিপিএস এর টাকা সংগ্রহ করতো। ভুক্তভোগীদেরকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো তারা যদি সময়মত সঞ্চয়/ডিপিএস এর টাকা না পরিশোধ করে তাহলে তাদেরকে সঠিক সময়ে ঋণ দেওয়া হবে না। মেয়াদ শেষে তারা মুনাফা কম পাবে এবং জরিমানাও করা হবে।
চক্রটি ফ্ল্যাট ও জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও প্রতারণা করে আসছিলো বলে জানান র্যাবের এই এই কর্মকর্তা।
র্যাব আরও জানায়, প্রতারণার আর একটি কৌশল হিসেবে ভুক্তভোগীদেরকে বুঝানো হতো যে দৈনিক মাত্র ২০০-৩০০ টাকা করে জমা করলে ঢাকা শহরে তাদের একটি করে ফ্ল্যাট বা জমি দেওয়া হবে। এছাড়া প্রতারক চক্রটি ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এবং ভুয়া ও অনুমোদনবিহীন ‘মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন’কে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করতো।
