সম্প্রতি গণমাধ্যমে একটি সংবাদ চোখে পড়ল যার শিরোনাম ছিল এমন, ‘ইংরেজি সাইনবোর্ডে কালি লাগাচ্ছে চসিক (চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন)’। বিস্তারিত পড়ে জানা যায়, ভাষার মাস ফেব্র‚য়ারিতে নগরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ইংরেজিতে লেখা নামফলকে (সাইনবোর্ড) কালো কালি লাগিয়ে দিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কাজটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে ভাষার মাস ফেব্র‚য়ারি এলেই এমন নানা ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়, কিন্তু মাস শেষে আবার সবকিছু ঝিমিয়ে যায়।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ বাংলায়ই মনের ভাব প্রকাশ করে আসছে। এটি একটি অন্যতম প্রাচীন ভাষা হলেও বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করেই আজকের এ পর্যায়ে এসেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বর্ষ ভাগ হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আঘাতটাই আসে বাংলা ভাষার ওপর। মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষার জন্য এমন বিরল অবদানের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
আমাদের এ অঞ্চল দীর্ঘদিন বিদেশি শাসকদের কাছে পরাধীন ছিল। প্রতিটি শাসকই তাদের ভাষা এদেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। সংস্কৃত, ফারসি ও ইংরেজি ভাষাও কখনো কখনো সরকারি ভাষা হিসেবে চালু হয়েছে। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীরাও চেয়েছিল উর্দুকে এ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে। কিন্তু বাদ সাধে বাঙালিরা, তাদের প্রবল বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
সুদীর্ঘকাল থেকে ফেব্র‚য়ারি মাসই কেবল ভাষার মাস হিসেবে চলে আসছে, যা মোটেও কাম্য নয়। ভাষার মাস বলে আলাদা কোনো মাস থাকতে পারে না। বছরের সব মাসই ভাষার মাস। ফেব্র‚য়ারি মাস এলেই কেবল একশ্রেণির লোকদের মধ্যে ভাষাচর্চা শুরু হয়। মাস জুড়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। আবার মাসটি চলে গেলে সবাই ভুলে যায়।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্যই ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু আমাদের অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছরেও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন সম্ভব হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তভুর্ক্ত করেন। সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এর মানে সংবিধান যেদিন প্রণীত হলো, সেদিন থেকেই এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ১৬ জুলাই ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। যা কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। পাশাপাশি ইংরেজি বা অন্য ভাষাগুলো ব্যবহার করা যাবে।
১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭’ প্রণয়ন করা হয়। ঐ আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিত হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোনো কর্মস্হলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’
২০১৪ সালের ১৭ ফেব্র‚য়ারিতে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ অনুযায়ী অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। পাশাপাশি দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, নামফলক ও গাড়ির নম্বর প্লেট, বিলবোর্ড এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন বাংলায় লেখা ও প্রচলনের নির্দেশ দেন। সব রকম নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলেন। আদালতের আদেশের তিন মাস পর ২০১৪ সালের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলা হয়। কিন্তু সে আদেশের সফল বাস্তবায়ন আজও সম্ভব হয়নি।
বিচার বিভাগ অর্থাত্ আইন ও আদালত মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। কিন্তু সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকে রায়গুলো ইংরেজিতে লেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ ইংরেজি পড়তে ও বুঝতে সক্ষম নন। এখন নিম্ন আদালতের অধিকাংশ রায় বাংলায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালত আইন এবং রেফারেন্সের দোহাই দিয়ে অধিকাংশ রায়ই ইংরেজিতে দিচ্ছেন। যদিও উচ্চ আদালতের কয়েক জন বরেণ্য বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলায় লেখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘যে ভাষা আমরা সবাই বুঝতে পারি, সেই ভাষায় রায় লেখা উচিত।’
আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজন ও গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে ইংরেজি ভাষা শিখতে হবে। বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী দেশ চীন, জাপান, কিউবাসহ অনেক দেশই নিজেদের ভাষার মাধ্যমেই দেশকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর বিদেশি ভাষার পত্তন।’
সর্বস্তরে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গোড়াতে হাত দিতে হবে। আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো শিক্ষাক্ষেত্র। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে সমাজ, দেশ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের যদি শৈশব থেকেই ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করা যায়, তাহলে তারা পরবর্তী কর্মজীবনেও ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সক্রিয় থাকবে। আস্তে আস্তে মাতৃ ভাষানুরাগী একটি জাতি গড়ে উঠবে।
বাংলা শুধু আমাদের মাতৃ ভাষাই নয়, আমাদের গৌরব ও অহংকারের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীতে একমাত্র ভাষা যার জন্য অকাতরে রক্ত দিয়েছে এ দেশের বীর সন্তানেরা। বাংলা ভাষাকে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যায়নি।
লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা

