বেশ কয়েক সপ্তাহ আলোচনা, বাগ্বিতণ্ডা ও কূটনৈতিক তত্পরতা ব্যর্থ হইল। বৃহস্পতিবার ভোরে ইউক্রেনের মাটিতে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণ এবং পরপরই রাশিয়ার শক্তিশালী সেনাবাহিনী ইউক্রেনের সীমানা অতিক্রমের মধ্য দিয়ে পূর্ব ইউরোপে শুরু হইল আরো একটি যুদ্ধ। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী এই সম্পাদকীয় লেখার সময় পর্যন্ত আট জনের প্রাণহাণি ঘটিয়াছে। অন্তত পাঁচটি শহরে হামলা হইয়াছে এবং ৬ লাখ ৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের দেশটিকে রাশিয়া তিন দিক হইতে ঘিরিয়া রাখিয়াছে।
যুদ্ধের ময়দান পূর্ব ইউরোপে হইলেও ইহার সঙ্গে এখন পর্যন্ত জড়াইয়া আছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো জোট, যাহারা ইউক্রেনকে অস্ত্র ও সমর সরঞ্জামাদি সরবরাহ করিয়া আসিতেছিল। তাই সকল কিছু মিলাইয়া এই যুদ্ধের পরিণতি কী হইবে, তাহা বলিবার সময় এখন নহে। ইতিমধ্যেই পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর বেশ কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়াছে। রাশিয়া হইতে জার্মানি পর্যন্ত বিশাল গ্যাসলাইন নর্ড স্ট্রিম-২ বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট যুদ্ধের প্রস্ত্ততি লইয়া রাশিয়ার সীমান্তবর্তী পোল্যান্ড, লাটভিয়ার মতো দেশগুলিতে জড়ো হইয়াছে। ইহা অস্বাভাবিক নহে যে, এই যুদ্ধে বহু দেশ জড়াইয়া পড়িতে পারে। যদি ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী দেশগুলি জড়াইয়া না-ও পড়ে, এই যুদ্ধের তাপ পড়িবে বিশ্বের সকল দেশেই।
যুদ্ধ মানেই প্রাণহানি, যুদ্ধ মানেই শান্তিভঙ্গ। ইহা সকলের জানা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ হয়। কোনো দেশের স্বার্থে আঘাত লাগিলে, কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি হইলে, কোনো দেশ অপর দেশকে নিজ দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করিলে তা যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের নিকট হইতে ক্রিমিয়াকে দখল করিয়া লইবার পর হইতেই রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলির সম্পর্ক উত্তপ্ত হইয়া উঠে। ইউক্রেন ২০০৮ সালে ন্যাটো জোটে যোগদানের জন্য আবেদন জানায়। পরে কয়েক বত্সর দেশটির সরকার পরিবর্তনের ফলে সেই আবেদন বাক্সবন্দি হইয়া থাকে। ২০১৯ সালে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার অভিলাষে ইউক্রেনের সংবিধানে সংশোধনী আনায় এবং ২০২১ সালে ব্রাসেলস সম্মেলনে ন্যাটো নেতাদের ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করিয়া লইবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করার পর হইতেই রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা তীব্রতর হইয়া উঠে। উল্লেখ্য, পূর্বে রাশিয়াকে ন্যাটো জোট প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল যে, পূর্ব দিকে এই জোট আর সম্প্রসারণ করা হইবে না। কিন্তু তাহা রক্ষা হয় নাই। রাশিয়া মনে করিতেছে, ন্যাটো তাহার দুয়ারে আসিয়া উপস্হিত হইয়াছে। ইহা রাশিয়ার জন্য শুভ নহে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলিয়াছেন, ন্যাটো এতই নিকটে চলিয়া আসিয়াছে যে, মস্কো আক্রমণ করিতে তাহাদের ৩০ মিনিট সময় লাগিবে। উল্লেখ্য, নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো একটি সামরিক জোট।
যুদ্ধের প্রথম গোলা ছুটিবার সঙ্গে সঙ্গে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারমূল্য রাতারাতি ১০০ ডলার ছাড়াইয়া গিয়াছে। আন্তর্জাতিক সোনার বাজার, বিশ্বের বহু শেয়ারবাজার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়িয়াছে। এমনিতেই গ্যাস ও তেলের বাজার বেশ কিছুকাল ধরিয়াই চড়া ছিল, কিন্তু বিশ্বের সবচাইতে বড় গ্যাস উত্পাদনকারী এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তেল উত্পাদনকারী দেশ রাশিয়া যুদ্ধে জড়াইয়া পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছে। এহেন পরিস্হিতিতে ইহার রেশ আসিয়া বাংলাদেশেও পড়িবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। তবে রাজনৈতিক বিবেচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্হান ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কাহারো সঙ্গে শত্রুতা নহে’ নীতিতে থাকাটাই হইবে আমাদের জন্য বুদ্ধির পরিচয়। ইহা নিশ্চয়ই আমাদের নীতিনির্ধারকরা জানেন। দুইটি পক্ষের সহিত বাংলাদেশের রহিয়াছে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ। ইহা ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনো অবস্হানের ব্যাপারে সতর্ক থাকিতে হইবে। যুদ্ধ কাহারো কাম্য নহে। আমরা আশা করিব, বিশ্বনেতারা একত্রে বসিয়া এখনো এই সমস্যাটি সমাধান করিবার প্রয়াস পাইতে পারেন। তাহাতে অসংখ্য প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা হইবে।
