ভাষা-সংস্কৃতির হালচিত্র

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:০৯

ফেব্রুয়ারি মাসকে ভাষার মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়ে থাকে। যেমন মার্চ স্বাধীনতার মাস, ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, আগস্ট শোকের মাস। ধর্মীয়ভাবেও সংযম সাধনার রোজার মাসও কিন্তু রয়েছে। আমরা এখন ভাষার মাসের ভেতর রয়েছি। ভাষার মাস প্রচারণা অনিবার্যরূপেই অপ্রাসঙ্গিক। ভাষাকে মাসে সীমাবদ্ধ করা তো রীতিমতো উপহাসতুল্য। প্রতি বছর এই মাসে আড়ম্বরপূর্ণ বইমেলা আয়োজন করে থাকে বাংলা একাডেমি। এই বইমেলা নিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে আমাদের গণমাধ্যম শুরু করে লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও দর্শনার্থীরা। প্রাণের মেলা, হৃদয়ের মেলা, ভালোবাসার মেলা, নানা বিশেষণে ভূষিত করা হয় বইমেলাকে। প্রকাশকেরা হরেক বই নিয়ে হাজির হয় বইমেলায় জ্ঞান বিতরণে, আর পাঠকেরা বই ক্রয়-সংগ্রহ করে জ্ঞান আহরণে সুযোগপ্রাপ্ত হয়।

একুশের বইমেলা আমাদের সামগ্রিক জ্ঞান আহরণে ঋদ্ধ হতে সর্বাপেক্ষা সাহাঘ্যকারী মেলা। বই ভিন্ন তো জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। তাই অন্যসব মেলার সঙ্গে বইমেলাকে গুলিয়ে ফেললে সেটা হবে চরম গর্হিত মানসিকতার প্রকাশ। বইমেলা প্রাণের মেলা হিসেবে গণ্য হতে পারে যদি তার সঙ্গে চেতনাগত অঙ্গীকারের সমন্বয় ঘটে। নয়তো এ সমস্ত স্ত্ততি তামাশাপূর্ণই। আমাদের মাত্রাতিরিক্ত আবেগ-উচ্ছ্বাসে চেতনা অসার এবং মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসারও মৌলিক অঙ্গীকারটি ঢাকা পড়ে যাবে। আমাদের সামগ্রিক জীবনাচারে মাতৃভাষাকে অবজ্ঞার অজস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা মোটেও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার বহুল ব্যবহার ক্রমেই সংকুচিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

অতীতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাংলার পরিবর্তে চাপিয়ে দেওয়া উদু‌র্ ভাষাকে আমরা ত্যাগে-আত্মত্যাগে প্রতিরোধ করতে পেরেছিলাম। অথচ বিনা চাপাচাপিতে এখন হিন্দি ভাষা সানন্দে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের হিন্দিপ্রীতিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলা খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিশ্ব হিন্দি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ টেলিভিশনে নিয়মিত হিন্দি ভাষার সিরিয়াল ও চলচ্চিত্র দেখেন। বাংলাদেশে হিন্দি ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ হিন্দি ভাষা বোঝেন, তবে লিখতে ও পড়তে পারেন না। যারা হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে আরো বিস্তৃত জানতে আগ্রহী তাদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে হিন্দি বিভাগ বড় সুযোগের সৃষ্টি করেছে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক আরো দৃঢ় ও গভীর হবে।’ আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই হিন্দি ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। অথচ হিন্দি ভারতের রাষ্ট্রভাষা নয়, সরকারি ভাষা। বহু ভাষাভাষী ভারতের অপরাপর ভাষার ন্যায় হিন্দিও আঞ্চলিক ভাষা বইকি। ধর্মীয় বিভাজনে অর্থাত্ দ্বিজাতিতত্ত্বে খণ্ডিত ভারতবর্ষে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ মানুষের ভাষা কিন্তু উদু‌র্ ছিল না। উদু‌র্ ভাষার বর্ণমালা আরবি-ফারসি বর্ণমালার আদলের কারণে ধর্মীয় অনুভূতি তখন অতিমাত্রায় ক্রিয়াশীল ছিল বলেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা ধর্মীয় আনুগত্যে নিজেদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে উদু‌র্কে রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণে দ্বিধা করেনি। নিজেদের মাতৃভাষা বিলোপে করেনি প্রতিবাদও। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল একাধিক জাতি। যাদের ভাষা-সংস্কৃতিও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। যেমন পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান খাইবার পাখতুনখোয়া), কাশ্মীর, সিন্ধু, বেলুচিস্তান। এই পাঁচ প্রদেশ নিয়েই অতীতের পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাত্ আজকের পাকিস্তান রাষ্ট্র। পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা উদু‌র্। এছাড়া বিভিন্ন জাতিসত্তার পাঞ্জাবি, সিন্ধি, সারাইকি, পশতু, বেলুচি, ব্রাহুই ইত্যাদি ভাষা স্ব-স্ব জাতির মাতৃভাষারূপে মর্যাদাপূর্ণ অবস্হানে থাকলেও; উদু‌র্ ভাষার চাপে ঐসব ভাষা বিলীন হয়ে গেছে। পাকিস্তানের ভূখণ্ডের থেকে প্রায় ২ হাজার মাইল দূরত্বের পূর্ব বাংলা বিচ্ছিন্ন এক প্রদেশ। পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া উদু‌র্ ভাষা গ্রহণ না করে নিজেদের মাতৃভাষাকে বিলুপ্তির থেকে রক্ষা করেছিল, ত্যাগ-আত্মত্যাগে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ ধরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি। অথচ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার অবাধ প্রচলনে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আজও দূর করা সম্ভব হয়নি।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে অত্যন্ত দুঃখ-বেদনার সঙ্গে লক্ষ করা যায় ঔপনিবেশিক ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে ক্রমেই মাতৃভাষা-সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। উদু‌র্ ভাষার মতো হিন্দি ভাষা আমাদের ওপর বলপূর্বক চাপানো হয়নি। হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রযুক্তির কল্যাণে, বিনা বাধায়। হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক দাপটে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির চাপে-দৌরাত্মে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অহিন্দি ভাষার প্রদেশসমূহের চিড়েচ্যাপটা হওয়ার দশা। এক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের চার রাজ্যের-চার ভাষাভাষী তামিল, তেলেগু, মালায়ালম, কন্নড়ভাষীরা নিজেদের মাতৃভাষার মর্যাদাপূর্ণ অবস্হান নিশ্চিত করতে পেরেছে। যে-আমরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কতৃ‌র্ক প্রবল চাপাচাপির পরও উদু‌র্ ভাষাকে পরিত্যাগ করতে পেরেছিলাম, সেই আমরাই এখন বিনা চাপে সানন্দে হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতিকে বরণ করে নিয়েছি, মাতৃভাষা-সংস্কৃতি পরিত্যাগে। এ বিষয়ে একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। গল্পটি মওলানা ভাসানী বলেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান উদ্যোক্তা বেলাল মোহাম্মদকে। তার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বইতেও গল্পটি রয়েছে। গল্পটি এই রকমের :‘একটা ছাগলকে তাড়া করেছিল একটা হিংস্র বাঘ। একজন মৌলভি তখন বাঘের হাত থেকে ছাগলটিকে রক্ষা করেছিলেন। মৌলভী ঘাস-পাতা ইত্যাদি পুষ্টিকর খাদ্য খাইয়ে ছাগলটিকে মোটা-তাজা করে তুলেছিলেন। একদিন স্বয়ং মৌলভি ছাগলটিকে জবাই করতে উদ্যত হলে ছাগলটি বলেছিল : আপনি সেদিন আমাকে বাঘের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এখন নিজেই আমাকে জবাই করে খেতে চাইছেন কেন? উত্তরে মৌলভি বলেছিলেন : বাঘ তো তোমাকে হারাম পম্হায় খেতে চেয়েছিল। আমি তো তোমাকে হালাল উপায়ে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জবাই করেই খাব।’

মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এখনো যদি আমাদের টনক না নড়ে, তাহলে আগামীতে এর খেসারত গুনতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়া সম্ভব না হলে, আমাদের মাতৃভাষা-সংস্কৃতির রক্ষা যেমন অসম্ভব হয়ে পড়বে তেমনি মাতৃভাষার অগ্রসরমাণতা প্রবলভাবে ব্যাহত হবে। মাতৃভাষার পরিসর হয়ে পড়বে সংকীর্ণ, নি‚মুখী-পশ্চাত্পদ। সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। মাতৃভাষার হৃতাধিকার পুনরুদ্ধারে প্রকৃত জাতীয়তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া ব্যতীত এই মুহৃর্তে ভিন্ন কোনো পথও খোলা নেই। নয়তো ভাষার মাস বছরান্েত আসবে-যাবে, আমরা কেবল আবেগ-উচ্ছ্বাসে বিগলিত হব। রাষ্ট্রে ও সমাজে বাংলা ভাষার প্রসার-প্রচলন ক্রমাগত সংকুচিত হবে। আমরা সংকরজাতিতে পরিণত হব। আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে হাঁটবে। কেননা জাতিসত্তার ভিত্তিমূলেই রয়েছে ভাষা। একমাত্র ভাষাই জাতি পরিচয় নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি। সমষ্টিগত আন্দোলনেই বিদ্যমান ব্যবস্হার বদলে এবং ভাষা-সংস্কৃতি আগ্রাসন রুখে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা সম্ভব হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন