শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আমি বইমেলায় যাই বই কিনতে, কারণ...

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০৫

যখন তরুণ ছিলাম, বইমেলায় গেলে অনেক বই কিনতে পারতাম। জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, মানিক বন্দ্যােপাধ্যায়, বিভূতি-ভূষণ—সব মোটা মোটা সংগ্রহ কিনেছি প্রতীক/অবসর থেকে। কিনেছি গল্পগুচ্ছ, কিংবা সঞ্চয়িতা এবং গীতবিতান। খুঁজে খুঁজে বের করেছি সাহিত্যপ্রকাশ, কিনেছি মাহমুদুল হক। জাতীয় সাহিত্য ভবন থেকে কিনেছি হাসান আজিজুল হক। মাওলা থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে সৈয়দ শামসুল হক। বইমেলায় হাঁটতাম। মেরিনা সঙ্গে থাকতেন। হুমায়ুন আজাদ একবার বলে বসলেন, তোমরা এখনো একসঙ্গে আছ? আর তসলিমা বলেছিলেন, হাত ধরে হাঁটার কী হলো!

তারপর বইমেলায় যেতাম ‘বইমেলা প্রতিদিন’ লিখতে।  ভোরের কাগজে আমি অনেকদিন এই শেষ পৃষ্ঠার ফিচারটা লিখেছি। আমার ধারণা, আমরা, ভোরের কাগজেই বইমেলা প্রতিদিন লেখা প্রবর্তন করি। যদি ভুল বলে থাকি, যে কেউ সংশোধনী দেবেন। কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ (১৯৩৩-১৯৯৮) লিখতেন দৈনিক সংবাদে। তারপর নিজেই লেখক হয়ে গেলাম। এখন বইমেলায় বই কেনার জন্য যেতে হলে যেতে হবে কর্মদিবসে দুপুরবেলা। যখনও ভিড় শুরু হয়নি। এখন তো সবার হাতে ক্যামেরা। সেলফি তোলার বান বইছে। এখন আপন মনে হাঁটতে পারি না, বই কিনতে পারি না। এখন বইমেলায় গেলে কেউ না কেউ দাঁড় করিয়ে বলে, একটা পিক তুলি? পিক মানে পিকচার। আজকালকার ছেলেমেয়েরা পিকচারকে পিক বলে, ব্রাদারকে ব্রো।

তবুও বইমেলা ভালো লাগে। প্রতিবছর বই কিনি। এ বছরও কিনব। অবশ্য এখন একটা সুবিধা হয়েছে যে প্রথমা স্টলে বসেই বই কিনতে পারি। কিছু বই উপহার পাই। কিছু প্রকাশক আমার কাছ থেকে টাকা নিতে চান না। আমি জোর করে টাকা দিই। নতুন লেখকদের বই কিনি আগ্রহ-সহকারে। তাদের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিই।

অনেক লেখককে হারিয়েছি গত ক-বছরে। হাসান আজিজুল হক স্যার নেই। শহীদুল জহির নেই। সৈয়দ শামসুল হক নেই। অটোগ্রাফ নেওয়া হবে না। তবে তাঁদের বই আছে। সেসব থেকে বাছাই করে কেনা যাবে।

হুমায়ূন আহমেদ স্যার নেই। অন্যপ্রকাশে ভিড় কিন্তু ঠিকই আছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল বইমেলায় গেলে কিশোরেরা মৌমাছির ঝাঁক হয়ে তার পিছু নেবে ঠিকই। আহসান হাবীব ভাই থাকবেন উন্মাদ স্টলে। এবার মিস করছি আমীরুল ইসলাম আর লুত্ফর রহমান রিটনকে। রিটন ভাই কানাডা থেকে আসেননি নাকি! আমীরুল ভাই কি খানিকটা অসুস্হ! তার সুস্হতা কামনা করি।

বইমেলার মেয়াদ ১৭ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হোক। গত বছর মেলায় প্রকাশকদের স্টল বানানোর খরচই ওঠেনি। এবার যেন সেই ক্ষতি পুষিয়ে যায়। আমার নিজের ধারণা, মার্চে পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নেবে। ওমিক্রন দিয়েই তার বিদায়ের পালা শুরু। আমরা বইমেলায় যাব। অমর একুশে গ্রম্হমেলা। ভাষাশহিদদের স্মরণ করব। আর আমাদের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের বইগুলো সংগ্রহ করব।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মহাসমুদ্রের শত বত্সরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারি যে, সে ঘুমাইয়া-পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্হির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে! হিমালয়ের মাথার উপরে কঠিন বরফের মধ্যে যেমন কত কত বন্যা বাঁধা আছে, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে মানব-হূদয়ের বন্যা কে বাঁধিয়া রাখিয়াছে!’

জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি-কেননা তাদের হূদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভেতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহাঘ্য করেছে।’

মানে বলতে চাইছি, শত বছরের মনীষার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ধরা আছে বইয়ে। কাজেই বই কিনব। বই পড়ব। বইমেলায় যাব।

ইত্তেফাক/কেকে