গ্যালারির ভেতরে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। চারিদিকে শুধু বাংলার মৃিশল্পীদের হাতে তৈরি মাটির পুুতুল ও নানা ধরনের খেলনা। মাটির তৈরি এসব পুতুলের মধ্যে গরু, হাতি, মহিষ, ঘোড়া, পাখি, রিকশা ও চালক, টেপা পুতুল, ময়ূর, কিষানি ও গরু, ঢেঁকিতে পাড়, বাঘ, নৌকা, সিংহ, পায়রা, চাকা লাগানো ঘোড়া, প্রদীপ হাতে নারী, পেঁচা, চাকা লাগানো মহিষ, মা ও শিশু, মসলা বাটা, মাছ কুটা—যার সবটা জুড়েই গ্রামবাংলার ছোঁয়া। আরো ব্যাপার হলো— বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয় জেলা থেকে সংগ্রহ করা এসব পুুতুল জায়গা ভেদে, শিল্পভেদে বৈচিত্র্যে ভরা। একপাশে আছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সংগ্রহ করা বেশ কিছু পুতুলের প্রদর্শনীও। আর এর সবটাই এখন শোভা পাচ্ছে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে। শিল্পাচার্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এমন একটি মাটিঘেঁষা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন শিল্পী সামিনা হাফিজ। পাশাপাশি ছিল এই লোকজপ্রেমী শিল্পীর ‘পুতুল: বাংলার প্রাণ-প্রতিমা’ বইয়ের প্রকাশনা উত্সব।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্মরণে আবহমানকালের মৃিশল্পীদের প্রতি উত্সর্গিত বইটির মোড়ক উন্মোচন ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগের ছয় জেলার সংগৃহীত মাটির পুতুল ও খেলনা প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। আলোচনায় অংশ নেন দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ডিজাইনার চন্দ্র শেখর সাহা, শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ, শিশুসাহিত্যিক শাহজাহান কিবরিয়া প্রমুখ। এই আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান ও পুরো আয়োজনটি নিয়ে কথা বলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কনিষ্ঠ পুত্র ময়নুল আবেদিন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন মৃিশল্পী শোভা রানী পাল, গবিন্দ চন্দ্র পাল, রমেন চন্দ্র পাল, বিপ্লব পাল ও লিটন চন্দ্র পাল।
তাসমিমা হোসেন বলেন, লোকজ শিল্প অন্বেষণে এই গবেষকের আগ্রহ অপরিসীম। মৃিশল্পীরা বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। আর তাদের অবদানকে সবার মাঝে তুলে এনেছেন সামিনা নাফিজের মতো গবেষকরা। তাদের মতো প্রাণিত মানুষরাই এই চিরায়ত শিল্পকে হারিয়ে যেতে দেন না। পরবর্তীকালে প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে গবেষণা কাজ চালিয়ে যান।
চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, মাটিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন পাল শিল্পীরা। আর সংগ্রাহকরা সময়কালকে ধারণ করে তা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য রেখে যান। যেমন রেখে গেছেন শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন। সামিনা তার গবেষণায় সেই কাজকেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
মইনুদ্দীন খালেদ বলেন, মাটিকে লালন করেন এই পাল সম্প্রদায়। এই নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর শিল্পভাষাকে আমরা চিনতাম না। তাদের চিনেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তার কারণেই বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। বেঁচে রয়েছে। শিল্পাচার্যকে অনুসরণ করেই প্রান্তিক মানুষের কাছে ছুটে বেরিয়েছেন সামিনা। তিনিও বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে তুলে এনেছেন বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারাকে।
শিল্পী সামিনা জামান জানান, এই পুতুলই কিন্তু আমাদের প্রাচীন ভাস্কর্য। মজার ব্যাপার হলো—একই বিষয় হয়তো দুজন মৃিশল্পী কাজ করছেন, কিন্তু কাজের ধরন, শিল্পকর্ম দেখা যায় একেবারেই ভিন্ন। ২০১৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সংগৃহীত পুতুল নিয়ে একটি প্রদর্শনী হয়। সেখান থেকে আমি অনুপ্রাণিত হই। শিল্পাচার্যের পুত্র ময়নুল আবেদিনের সঙ্গে কথা বলি। এরপর ২০১৬ থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করি। বাংলার মৃিশল্পীদের বৈচিত্র্যময় এসব পুতুল সংগ্রহে ঘুরতে থাকি বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয়টি জেলায়। জেলাগুলো হলো—ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল।
ইউডেকো লিমিটেডের সার্বিক সহযোগিতায় মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে ‘পুতুল: বাংলার প্রাণ-প্রতিমা’ গ্রন্থ প্রকাশনা, তথ্যচিত্র ও মৃিশল্পীদের শিল্পকর্মের সমন্বয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। শিল্পী সামিনা নাফিজের দুই বছর ছয় মাসের মাঠপর্যায়ের জরিপের ফসল এটি। এতে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয় জেলার ৪৫ জন লোক ও কারুশিল্পীর তৈরি পুতুলের পাশাপাশি আরো কিছু শিল্পকর্ম এতে স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে মাঠ পর্যায়ে জরিপের সময়ের মেলা থেকে সংগৃহীত মাটির শিল্পীদের তৈরি দেশি খেলনাও স্থান পেয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মে টেপা পুতুলের আদল পরিলক্ষিত হয়। তা বিশ্লেষণের জন্যেও শিল্পীর চিত্রকর্মও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনী চলবে রবিবার পর্যন্ত।
