এখন প্রয়োজন কেউ পাশে থাকুক 

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:৩৫

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। এই ব্যস্ততার কারণে সামাজিকতা, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ইত্যাদি সম্পর্কগুলো আজকাল বড় ফিকে হয়ে আসছে। এজন্য আমরা একে অন্যের উপর দোষ চাপাই। ব্যস্ত জীবনে আমাদের কেবল উর্ধশ্বাসে ছুটে চলা। এ অবস্থায় অনেকেরই ঘরে থাকেন এমন কেউ যিনি ছুটে চলা এই ব্যস্ত শহুরে জীবনের যত ব্যস্ততা সব শেষ করে যেন মিশে গেছেন কোনো এক নিস্তব্ধতার মাঝে। আর আমরা দিন শেষে ঘরে ফিরে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকি বালিশে শুকিয়ে থাকা বয়স্ক অসুস্থ প্রিয়জনের চোখের জলের দিকে। তার সমাধান পেতে আতিপতি করে খুঁজি বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা। বৃদ্ধাশ্রমই কি সমাধান?

সেকালে সংসারের সব কাজ সেরে নিজের মতো জীবনযাপন করতে বাণপ্রস্থের পথে এগিয়ে যেতেন বয়স্ক লোকেরা। সংসার ত্যাগ করে ঈশ্বরচিন্তায় দিন অতিবাহিত করার জন্য এই ব্যবস্থা। সে যুগ বাসি হয়েছে। আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এই নিয়ম আর মানা হয় না বা চলে না। একান্নবর্তী পরিবারে সকলে মিলেমিশে থাকাই প্রচলন ছিল। বাড়ির বয়স্কজন সসম্মানে সংসারের কর্তা হয়ে সবাইকে দেখাশোনা করতেন। ছেলেরা বড় হলে বিয়ে-শাদি করে হাল ধরতেন তাঁরাই। সেখানে বাবা-মা বা বয়স্ক সদস্যদের যত্নের কোনো ত্রুটি হতো না। নাতি-নাতনি নিয়ে আনন্দে নির্ভার দিন কাটাতেন। শিশুরাও পেত মানসিক বৃদ্ধিতে এক চমত্কার মনোরম পরিবেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক পরিকাঠামোর পরিবর্তন স্বাভাবিক। আর এরই ফলে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হলো। আমরা পেলাম নিউক্লিয়ার পরিবার। বসবাস ছোট্ট ছিমছাম ফ্লাটে। সেখানে জায়গা বড় অল্প। বাসিন্দা স্বামী-স্ত্রী। তারা দুজনেই চাকরিজীবী। এখানে স্বাধীন থাকার মনোবৃত্তি সব মিলিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করা নিয়ে ঘটে মন কষাকষি, অশান্িত। পুরোনো দিনের মন-মানসিকতার শাশুড়ির সঙ্গে পুত্রবধূর মনের মিল হয় না। ফলে পরিবারে ভাঙন ঘটে। সংসার থেকে নির্বাসিত হন বাবা-মা অবশ্যই তাদের অনিচ্ছায়। তারপর তাঁরা যদি অসুস্থ হন তাহলে সে হয় আরো অমানবিক ব্যাপার। যদিও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করা প্রতিটি সন্তানের একান্ত কর্তব্য। আইনও হয়েছে এ বিষয়ে। কিন্তু আইন করে তো সব কিছু হয় না।

অধুনিক সমাজব্যবস্থায় গতির যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিবেকবান মানুষ এখন বিকল্প চিন্তা করছে।

কেয়ার গিভার সারভিস। এ ধারণাটি বাংলাদেশে নতুন মনে হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কী কাজ তাদের? বাড়িতে থেকেই সেবাগ্রহীতাকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সময়মতো ওষুধ ও পথ্যাদি খাওয়ানো। পালস, জ্বর, ব্লাডপ্রেসার, ব্লাড সুগার, শ্বাস-প্রশ্বাস ও অন্যান্য ভাইটাল সাইন মনিটর, রেকর্ড এবং রিপোর্ট করা। বিশেষ করে চলাফেরা করতে পারেন না যাঁরা তাঁদের জন্য কেয়ার গিভার প্রয়োজন দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করবার জন্য। এ সার্ভিস শিশুদের জন্যও প্রয়োজন। এটি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশিক্ষিত কেয়ার গিভার হলে তো কথাই নেই। দারিদ্র্যবিমোচনে ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেয়ার গিভার পেশায় নারীরা বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বে কেয়ার গিভার-এর জনপ্রিয়তা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই এ পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন। এই লক্ষ্যে কুমুদিনী নার্সিং কলেজ স্পেশালাইজড নার্সিং কোর্সে প্রশিক্ষণ চালু করেছে। কুমুদিনী নার্সিং কলেজ এ কাজটি করছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগ কতৃ‌র্ক বাস্তবায়নাধীন ‍Skills for Employment Investment Program (SEIP)। এক বছর মেয়াদি স্পেশালাইজড নার্সিং কোর্সে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে রেজিস্টার্ড নার্সদের (শুধু নারী) জন্য এ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো দেশে স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তুলে কর্মসংস্থনের ব্যবস্থা করা। এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য সুবিধা এই যে প্রশিক্ষণ শেষে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণদের সনদপত্র প্রদান এবং কর্মসংস্থানের সহায়তা করা হবে। প্রশিক্ষণ চলাকালীন ছাত্রীদের বিনামূল্যে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ইংরেজি ভাষা ও কমপিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে। প্রশিক্ষণকালে মাসিক বৃত্তি প্রদান করা হবে।

শহিদ দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার স্বপ্নের ফসল কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম বেসরকারি জনকল্যাণকর সংস্থা। অল্প বয়সে চিকিৎসার অভাবে মাকে হারিয়েছিলেন রণদা প্রসাদ সাহা। তাই মায়ের স্মরণে জীবনে অর্জিত সমস্ত পুঁজি বিনিয়োগ করে পরবতী‌র্কালে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে দেশের মানুষদের বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের শিক্ষা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। কুমুদিনী নার্সিং কলেজ এই ট্রাস্টের একটি প্রতিষ্ঠান।

লেখক: শিক্ষক ও গল্পকার 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন