দশ দিগন্তে

সরকারের সামনে সমস্যা-শ্যাম রাখি না কুল রাখি

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৫:৩১

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা দিল্লিমুখী স্রোত শুরু হয়েছে। মন্ত্রীরা, পররাষ্ট্র দপ্তরের সেক্রেটারি, আওয়ামী লীগের সেক্রেটারিসহ আরো কয়েক জন হোমড়া-চোমড়া ছুটে গেছেন দিল্লিতে। স্পষ্টতই বোঝা যায়, আগামী নির্বাচনে জেতার জন্য, দিল্লিকে তুষ্ট করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। আগে এই প্রতিযোগিতা রেখে-ঢেকে করা হতো। এখন এটা স্পষ্ট।

বাংলাদেশে চীনকে একটু বেশি প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য ইদানীং ভারত যে রাগ করেছে, তার প্রমাণ আমেরিকার দ্বারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ। এটা ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর মতো। ভারত এখন আমেরিকার সঙ্গে ‘কোয়াড’-এর সদস্য। ভারত এখন ইসরাইলের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সামরিক সম্পর্কও বিরাট। ভারত-আমেরিকা-ইসরাইল যে ত্রিশক্তি এখন গড়ে উঠেছে, তা উপমহাদেশে চীনের অনুপ্রবেশ চায় না। অন্যদিকে ভারত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী অথবা শত্রু।

এশিয়ায় এখন দুটি সাব-সুপারপাওয়ার—একটি ভারত, অন্যটি চীন। বাংলাদেশ এ দুই শক্তির স্নায়ুযুদ্ধের মাঝখানে পড়ে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে। বাংলাদেশে কয়েকটি বড় প্রজেক্ট চীনের বিপুল অর্থ সাহায্যে শুরু হয়েছে। চীন যদি এখন এই বিপুল সাহায্য প্রত্যাহার করে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিরাট বিপর্যয় দেখা দেবে।

অন্যদিকে, ভারত আওয়ামী লীগের পেছনে না থাকলে আগামী নির্বাচনে দলটির জেতা সম্ভব হবে কি না, সন্দেহ। বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সমস্যার আবর্তে পড়েছে। মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করার যে স্বপ্ন আওয়ামী লীগ দেখছিল, তা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিলীন হয়ে গেছে। ভারতকে তুষ্ট করার জন্য তাই এই দিল্লি ও আগরতলা দৌড়াদৌড়ি।

আমি নগণ্য ব্যক্তি। তবু আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি। এজন্য বহু আগেই এই দল ও সরকারকে সতর্ক করেছিলাম চীনের দিকে বেশি ঢলে না পড়ার জন্য। চীন অথবা ভারত কারো সঙ্গেই বাংলাদেশের অতিরিক্ত মাখামাখির দরকার নেই। ভারতের সঙ্গে দুই দেশের স্বার্থে যতটুকু সহযোগিতা করা প্রয়োজন, আমাদের তা-ই করা উচিত।

অন্যদিকে, চীনের সাহায্য গ্রহণেও আমাদের সতর্ক থাকা উচিত ছিল। ‘কোয়াড’ অথবা চীন কোনো শিবিরের সঙ্গেই বাংলাদেশের বেশি যুক্ত হওয়া উচিত নয়। আমেরিকা যে দেশেই সাহায্য দেয়, কার্যত সেই দেশকেই তাদের অনুগত বানিয়ে ফেলে। তারপর তাদের ইচ্ছামতো সরকার বদলায়, দরকার হলে সরকারপ্রধানকে খুন করে। অন্যদিকে, চীন এশিয়া-আফ্রিকার যেসব ছোট দেশে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য নিয়ে গেছে, সেই দেশকে কার্যত দখল করে ফেলেছে।

বিপদে বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভর করতে পারে, ভারত তার স্বাধীনতা সংগ্রামের বন্ধু, কিন্তু চীনকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। চীন ছিল পাকিস্তানের বন্ধু। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার সময় পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোকে চীন আশ্বাস দিয়েছিল, ভারত বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সাহায্যের জন্য সৈন্য পাঠালে চীন হিমালয় সীমান্তে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে এবং ভারতকে সেই যুদ্ধে ব্যাপৃত রাখবে। ভারতীয় সৈন্য যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখনো চীন হিমালয় সীমান্তে তার সেনাবাহিনীকে বসিয়ে রেখেছে, তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নামায়নি।

পাকিস্তান এখন আমেরিকান দোস্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ফলে আমেরিকা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছে এবং আফগানিস্তানে চীন এখন তালেবানদের বন্ধু। ভিয়েতনামের স্বাধীনতাযুদ্ধে চীন বিরোধিতা করেছে, যেমন তারা বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ। সুতরাং চীনের সঙ্গে বেশি মাখামাখি বিপজ্জনক। এদিক থেকে ভারতের ওপর নির্ভরতা বেশি টেকসই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ২০ হাজার সৈন্য প্রাণদান করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার ভাঙা অর্থনীতি মেরামত করার জন্য ভারতই প্রথম এগিয়ে এসেছিল, চীন নয়।

দিল্লিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব তারা ক্ষুণ্ন করেনি। এই অবস্থায় ভারতকে চটিয়ে চীনের দোস্তি আমাদের কাম্য হতে পারে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ভেতরে কিছু নব্য ব্যবসায়ী ঢুকেছেন, যারা চীনের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করতে চান। কারণ তাতে দুর্নীতিও করা যায় বেশি।

শোনা যায়, চীনের বড় ব্যবসায়ীরাও প্রয়োজনে দুর্নীতিতে কম যান না। আমি যত দূর জানি, এই সম্পর্ক রক্ষায় শেখ হাসিনা ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণের অভিলাষী ছিলেন। কিন্তু তার এই ইচ্ছা পূরণ করতে পারেননি। আমলারা নব্য ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষক। নব্য ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত চীনাপ্রীতিতে তারা বাধা দেননি, বরং প্রশ্রয় দিয়েছেন। সরকারও আর্থিক সাহায্যের লোভে চীনের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। এখন এই বিপদের ফাঁদে তাদের পড়তে হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত একটি বড় ফ্যাক্টর। এই কথাটা অস্বীকার করা যাবে না। আবার ভারতেও যে ধরনেরই সরকার থাকুক, সেই সরকার ঢাকায় আওয়ামী লীগের সরকার আছে, তা দেখতে চাইবে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার তাদের যা সহযোগিতা দিতে পারে, তা বিএনপি সরকার পারবে না। বিএনপির রাজনীতির ভিত্তি ভারতবিদ্বেষ ও ভারতবিরোধিতা। সুতরাং দিল্লির সিংহাসনে কংগ্রেস থাকুক অথবা বিজেপি থাকুক, দুটি সরকারই ঢাকায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাইবে। বিজেপির সরকারও ক্ষমতায় এসে তা-ই চেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করে, তারা সেটা চাইবে না। আওয়ামী লীগ সরকার এখন দুই নৌকায় পা দিয়ে এই বিপদে পড়েছ।

এমনও হতে পারে, লন্ডনে বসে তারেক রহমান ভারতকে সব উজাড় করে দেবে—এই দানছত্র লেখায় দিল্লির অবস্থান আওয়ামী লীগের দিকে নেই। তাহলে আগামী নির্বাচনে সর্বনাশ! এ কথা বুঝে মন্ত্রীরা দল বেঁধে কেউ দিল্লিতে, কেউ ত্রিপুরায় ছুটেছেন। আওয়ামী লীগকে এখন দিল্লির কাছে আরো বেশি মাথা নত করতে হবে। তাতেও তাদের আগামী নির্বাচনে জেতা খুব কঠিন হবে। আমি প্রার্থনা করি, আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের এই দিল্লি ও আগরতলা ছোটাছুটি সফল হোক এবং এই সরকার যেন চীন ও ভারতের সঙ্গে একটা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রক্ষায় নির্ভরযোগ্য উপায় বের করতে পারেন।

আওয়ামী লীগ সরকার বহু দিন ধরেই তাদের আমলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গর্ব প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছেও। কিন্তু তার ভিত্তি পচনশীল ধনতন্ত্র। ধনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এককালে জাপান অর্থনৈতিক উন্নয়নে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তার ভিত্তিও ছিল ধনতন্ত্র, যে ধনতন্ত্র আমেরিকার সঙ্গে লেজে বাঁধা। ফলে মার্কিন অর্থনীতিতে পচন দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপানের অর্থনীতিতেও পচন দেখা দেয়। বাংলাদেশের উন্নয়নও ধনতন্ত্রভিত্তিক। তার ফলে এই উন্নতি নব্য ধনীদের উচ্চাশা মিটিয়েছে।

কিন্তু জনগণের জীবনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা মেটায়নি। ধনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের দ্রুত উন্নতি ঘটাতে গিয়ে তার পায়ের তলায় যে শিকড় গজায়নি, এটা এখন প্রমাণিত হচ্ছে। চীন তার অর্থনৈতিক সাহায্য প্রত্যাহার করলে বাংলাদেশের সর্বনাশ হবে। আবার সাহায্যদাতা দেশগুলোকে চটালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা অনিশ্চিত। বলা যায়, দেশ এক জাতীয় দুর্যোগের সম্মুখীন। প্রার্থনা করি, আওয়ামী লীগ সরকার এই সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য একটি পন্থা যেন নির্ধারণ করতে পারে।

বঙ্গবন্ধু ধনতন্ত্রভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বাস করতেন না। একদিন গণভবনে বসে কথা প্রসঙ্গে তিনি আমাদের কয়েক জন সাংবাদিকের কাছে বলছিলেন, ‘আমি ধনতান্ত্রিক উন্নয়নে বিশ্বাস করি না; সমাজতান্ত্রিক উন্নতিতে বিশ্বাস করি। তাতে উন্নতিটা টেকসই হয়; জনগণ উপকৃত হয়। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চোখ ধাঁধানো উন্নতি হয়, তবে তা জনগণের জীবনকে স্পর্শ করে না। শুধু ধনীদের ঘরে আলো জ্বলে। সমাজতান্ত্রিক উন্নতির গতি ধীর। তাতে মানুষ অনেক সময় ধৈর্য হারায়।

আমি যদি এখন মার্কিন-সাহাঘ্যনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নতির পথে যাই, তাহলে তোমরা দেখবে ঢাকা শহর রাতারাতি সিঙ্গাপুর হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাতে ঢাকায় আকাশছোঁয়া উঁচু বিল্ডিং উঠবে, তার নিচে চাপা পড়বে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর। সাধারণ মানুষের মধ্যে জীবনযাপনের যে বৈষম্য দেখা দেবে, তা হবে পীড়াদায়ক। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সবার বিকাশ সমান হবে। সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে। জীবনযাপনে ভালগার (Vulgur) অসাম্য দেখা দেবে না।

বঙ্গবন্ধুর এই কথা আজ সত্য হয়েছে। ভারত ও চীনের কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এনে আমরা ঢাকাকে প্রায় সিঙ্গাপুর বানিয়েছি। কিন্তু বড় বড় উড়ালসেতু এবং আকাশছোঁয়া বিল্ডিংয়ের নিচে সামাজিক সাম্য ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন তো এমন হয়েছে, সাহায্যদাতারা বিরাগ হয়ে তাদের সাহায্য প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিলে এই উন্নয়নের বালুঘর ভেঙে পড়তে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারকে তাই বলি, পারলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ফিরে যাও। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়—এই নীতিতে ফিরে যাও।

সামাজিক সাম্যের ভিত্তি ছাড়া যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তা চোখ ধাঁধানো হতে পারে; কিন্তু দেশে আর্থিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে না এবং নাগরিক অধিকারও নিশ্চিত করে না। আওয়ামী লীগ যে আদর্শের জন্য সংগ্রাম করেছে, তা বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতায় থেকে লাভ নেই।

লন্ডন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন