অন্যায় ছোট হোক কিংবা বড় হোক, ক্রমাগত তা চলতে থাকলে বা মেনে নিলে একসময় অন্যায়কেই স্বাভাবিক মনে হয়। কোনো অন্যায় বা আইনবহিভূর্ত কাজকে স্বাভাবিক বানানোর প্রক্রিয়া সমাজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে অবদমিত করে এবং অন্যান্য অপরাধকে উৎসাহিত করে। তাই আইনবহিভূর্ত কাজ আপাতদৃষ্টিতে যতই ছোট মনে হোক না কেন, তা প্রতিহত করা সমাজের প্রতিটি মানুষ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা তাদের পারিপাশ্বির্ক অবস্থান থেকে বিভিন্ন প্রকারের গণোৎপাত এবং শব্দ দূষণের শিকার হন। যেমন মধ্যরাত পর্যন্ত উচ্চমাত্রার শব্দে গানবাজনা কিংবা বাড়িভাঙা বা তৈরির অসহনীয় শব্দ।
সাধারণত স্বাভাবিক ক্ষতিকর ৬০ ডেসিবল স্বাভাবিক মাত্রার শব্দ এবং শব্দের মাত্রা ৮০ ডেসিবল হলে তা মানুষের জন্য বলে বিবেচনা করা হয়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে ৭০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ একজন ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে বধির করতে পারে এবং ১০০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ সম্পূর্ণ মাত্রায় বধির করে দিতে পারে। উচ্চশব্দে গানবাজনা বা নির্মাণ কাজ চললে শিক্ষাথীর্দের মনোযোগেই শুধু ব্যাঘাত ঘটে না, এটি নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা যেমন উচ্চরক্তচাপ, নিদ্রাহীনতা, বদহজম, মাথাব্যথা এমনকি গর্ভপাত পর্যন্ত ঘটাতে পারে। তাছাড়া উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ পশুপাখি এবং জীবজন্তুর জন্যেও ক্ষতিকর। উচ্চমাত্রার শব্দের গান বা নির্মাণকাজ হতাশা বা বিরক্তির উদ্রেগ করলেও অনেকেই হয়তো এই শব্দদূষণ বা উৎপাতকেই মেনে নেন বা মনে করেন এই সমস্ত ছোটখাটো ব্যাপারে আইনের কোনো প্রতিকার নেই। তাই আমাদের দেশের বিদ্যমান আইন এই ধরনের উৎপাত বা শব্দদূষণের ব্যাপারে কি বলে তা জানার প্রয়োজন রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষা আইন ১৯৯৫-এর ২০ ধারার অধীনে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট নির্দেশনা তৈরি এবং এলাকাভেদে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ মালা ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিমালা দিবা ও নৈশকালীন সময়ে আবাসিক এলাকা, নীরব এলাকা, মিশ্র এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবল এবং রাতের বেলায় ৪৫ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দের মানমাত্রা সহনীয় এবং আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য। নীরব এলাকা, যেমন হাসপাতাল কিংবা স্কুলসংলগ্ন এলাকায় দিনের বেলায় ৫০ এবং রাতের বেলায় ৪০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দের মানমাত্রা গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে মিশ্র এলাকায় (আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে একত্রে ব্যবহৃত এলাকা) দিনের বেলায় ৬০ ডেসিবল এবং রাতে ৫০ ডেসিবল শব্দের মানমাত্রা আইনের দৃষ্টিতে সহনযোগ্য। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা ২০০৬ সালের বর্ণিত তফসিলের মানমাত্রার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। যদিও এই বিধিমালা ধর্মীয় উপাসনালয়, ধমীর্য় অনুষ্ঠান, ইফতার-সেহরির সময়কালে প্রচার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রচারকালে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনকালে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠান প্রচারকালে, আকাশযান বা রেলগাড়ি চলাচলে সময়, অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ারব্রিগেডের ব্যবহারকালে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বিপদসংকেতের প্রচারকালে, মৃত্যুসংবাদ বা হারানোর বিষয় প্রচারকালে প্রযোজ্য হবে না।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ অনুসারে উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলো ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে অনুমতিপ্রাপ্ত না হলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। যথাযথ কতৃর্পক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে নীরব এলাকা ব্যতীত খোলা বা আংশিক খোলা জায়গায় সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রিয়া, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সভা বা অনুষ্ঠানে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না (ধারা-৯)। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের কমপক্ষে তিন দিন পূর্বে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে যথাযথ কতৃর্পক্ষের কাছে দরখাস্ত দাখিল করতে হবে। আবার সময়স্বল্পতার উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে অনুষ্ঠানের একদিন আগে দরখাস্ত দাখিল করা যাবে।
বিধিমালা ২০০৬-এর তফসিল তিন অনুযায়ী যথাযথ কতৃর্পক্ষ বলতে গ্রাম, পৌর ও উপজেলায় ইউএনও বা তত্কতৃর্ক ক্ষমতাপ্রদত্ত কোনো কর্মকর্তা, জেলাসদরে জেলা প্রশাসক বা তত্কর্তৃক ক্ষমতাপ্রদত্ত কর্মকর্তা এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় পুলিশ কমিশনার বা তত্কতৃর্ক মমতাপ্রদত্ত কোনো কর্মকর্তাকে বোঝাবে। কিন্তু রাজনৈতিক সভা ও মেলার ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার বা তত্কতৃর্ক ক্ষমতাপ্রদত্ত ও কোনো কর্মকর্তা এবং অন্যান্য এলাকায় জেলা প্রশাসক বা তত্কতৃর্ক ক্ষমতাপ্রদত্ত ও কোনো কর্মকর্তার কাছে অনুমতি নিতে হবে। তবে এ ধরনের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে উক্ত কতৃর্পক্ষ যে কোনো প্রকার অনুষ্ঠানে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যে কোনো যন্ত্রপাতি দৈনিক ৫ ঘণ্টার বেশি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করবেন না এবং অনুমোদিত সময়সীমা রাত ১০টার বেশি অতিক্রম করতে পারবে না (ধারা-৯)।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ গৃহ নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও কিছু বিধিনিষেধ নির্দেশ করে। বিধিমালায় ধারা ১১ অনুযায়ী আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে ঐ এলাকার নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত মিকচার মেশিনসহ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য মেশিন বা যন্ত্র চালানো যাবে না।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুসারে কোনো এলাকায় নির্ধারিত মানমাত্রার অতিরিক্ত শব্দদূষণসংক্রান্ত যে কোনো ক্রিয়া বা ঘটনার কারণে ঐ এলাকায় বসবাসরত কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা শব্দদূষণ বিধিমালার যে কোনো বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে মর্মে যে কোনো ব্যক্তি টেলিফোন, মৌখিক বা লিখিতভাবে কোনো তথ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে অবহিত করতে পারবেন। এমন তথ্যের সত্যতা যাচাইপূর্বক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিধি লঙ্ঘনকারীকে তাত্ক্ষণিকভাবে ঐ বিধান লঙ্ঘনের জন্য লিখিত বা মৌখিক নির্দেশ প্রদান করবেন এবং সেই ব্যক্তি ঐ নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবেন।
শব্দদূষণ বিধিমালা ২০০৬-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে কোনো ভবন বা স্থানে প্রবেশ অপরাধ সংঘটনের প্রমাণস্বরূপ শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি আটক করতে পারবেন। যদি কোনো ব্যক্তি শব্দদূষণের জন্য দোষী সাব্যস্হ হন তবে প্রথম অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড দণ্ডিত হবেন এবং পরবতীর্র জন্য অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আবার ফৌজদারি ১৮৯৮-এর ১৩৩ ধারা এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৬৮-এর ২৭৮ ধারায়ও উচ্চমাত্রার শব্দের ফলে সৃষ্ট বিরক্তি, যা জনগণের শারীরিক, মানসিক ক্ষতি করে তার প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী মানুষের সাধারণ স্বাচ্ছন্দে্য যা উল্লেখযোগ্যভাবে হস্তক্ষেপ করে এবং বিরক্তি বা ক্ষতির উদ্রেক করে তাই উপদ্রব এবং উৎপাত, যা দণ্ডনীয় অপরাধ। আবার দণ্ডবিধির ২৬৮ ধারায় বলা হয়েছে যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে বা এমন কোনো বে-আইনি বিচু্যতির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়, যা আশপাশে বসবাসকারী সম্পত্তির ব্যবহারকারী বা জনগণের কোনো সাধারণ ক্ষতি বা বিরক্তির সৃষ্টি করে, তবে সেই ব্যক্তি গণউপদ্রবের অপরাধে দোষী। ধারা ২৭৮ অনুসারে কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো স্থানের আবহাওয়া এমনভাবে দূষিত করে তুলে, যাতে ঐ স্থানের আসে পাশে বসবাসরত মানুষের স্বাস্হে্যর পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে পড়ে, তবে সে ব্যক্তিকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। ফৌজদারী কার্যবিধি অনুসারে উপদ্রব্য বা উৎপাতের অপসারণের জন্য জেলা বা প্রথম শ্রেণির মেজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন।
বাংলাদেশের সংবিধান জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে (অনুচ্ছেদ ৩২) জীবনের অধিকার শুধু টিকে থাকাকে বোঝায় না, এটি মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে মানসম্মত জীবনের অধিকারও দেয়। সুতরাং বলা যায়, কোনো ব্যক্তি যদি শব্দদূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে তার জীবনের অধিকার খর্ব হয়েছে। সুতরাং সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনের আলোকে উচ্চশব্দপাতের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। যারা শব্দদূষণের জন্য দায়ী, তাদের বেশির ভাগই শব্দদূষণ বা উৎপাত যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ কিংবা এটি যে নাগরিক অধিকারের আওতাভুক্ত, তা জানেন না। আবার অনেকেই হয়তো ভাবেন শব্দদূষণ বা উৎপাতের মতো ছোটখাটো অন্যায় নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নাই। কিন্তু আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে ছোটখাটো আইনের প্রতি মানুষ যেমন শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, তেমনটি ছোটখাটো অপরাধগুলোকেও দ্রুততার সঙ্গে নিমূর্ল করতে হবে। বিদ্যমান আইনে অতিমাত্রার শব্দের ব্যবহার উৎপাতের জন্যে উল্লেখিত জরিমানা অপর্যাপ্ত, যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের পর্যাপ্ত পুলিশের অভাব রয়েছে। তাই শব্দদূষণ বা উপদ্রবের মতে অপরাধগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা ওয়ার্ড কউন্সিলদেরকেও সংযুক্ত করা যেতে পারে। অনেক ভুক্তভোগী হয়তো ক্ষমতাশীল প্রতিবেশির ভয়ে মধ্যরাতে অতিমাত্রার শব্দের অত্যাচার সয়ে যান। সেক্ষেত্রে কীভাবে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন করে আইন অমান্যকারীকে আইনের আওতায় আনা যায়, তাও ভাবতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো বাড়ি বা ভবন নির্মাণের কাজ মানুষের শান্িতপূর্ণ জীবন যাপনে ব্যাঘাত না ঘটায়। একজনের আনন্দ বা লাভ যেন অন্যের বিরক্তি বা ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসন নয়, জনগণকেও তাদের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সচেতনতা তৈরিতে আমাদের গণমাধ্যম এবং এনজিওগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
