তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সেই দেশটিকে ক্রমশ নূতনতর উচ্চতায় উন্নীত করিতে সাহাঘ্য করে। স্বাধীনতার পর হইতেই উন্নয়নের এক ম্যারাথন যাত্রা শুরু করিয়াছে বাংলাদেশ। ইহার বিকল্প নাই। গত এক যুগে উন্নয়নের এই যাত্রায় গতি বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা নিঃসন্দেহে আনন্দের কথা। যদিও এখনো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সহনশীল পর্যায়ে পৌঁছায় নাই। এই জন্য বিভিন্ন উন্নয়নকাজের পাশাপাশি আমাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হইল দারিদ্র্যবিমোচন করা। এই সকল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উন্নয়নের জাল তৈরি করা হয়, যাহাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঐ জালের মাধ্যমে অন্তত অতিদরিদ্রে পতিত না হয়। কিন্তু এই জাল পাতিবার পরও ইহার মধ্যে কিছু ছিদ্র থাকিয়াই যায়, যাহা দিয়া কিছু দরিদ্র মানুষ পড়িয়া যায় দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই কারণে সরকার কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে ঐ অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নূ্যনতম উপায়ে বাঁচিবার পথ তৈরি করিয়া দেয়।
মানুষের সুষ্ঠু-সুন্দর জীবনধারণের জন্য নানান অবকাঠামোগত সুবিধা রাষ্ট্র হইতে প্রদান করা হয়। ইহার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, বিদু্যত্, সুপেয় পানি, দুর্যোগ প্রতিরোধ—এই সকল সুযোগপ্রাপ্তি মানুষের মৌলিক চাহিদা। প্রকৃত অর্থে, মানুষের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই জন্য সমস্যার গ্রাফও কখনো নিম্নগামী হয় না। তবে জগতে চিরকালই সমস্যা ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও নূতন নূতন সমস্যা আসিবে। কিন্তু সেই সমস্যাটিকে যদি সঠিক ও সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সমাধান করা সম্ভব না হয়, তাহা হইলে তো ঘোরতর বিপদ ঘনাইবে! এই ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা থাকা প্রয়োজন। প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি তাহার স্ব স্ব এলাকার মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করিতে পারিলে উন্নয়নক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়। গত এক যুগে সারা দেশে তাত্পর্যপূর্ণ দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে। ইহা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতারই সুফল। মনে রাখিতে হইবে, মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের যেই জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়াছেন তাহার সদ্ব্যবহার করিয়া মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য তাহা কাজে লাগাইতে হইবে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গিয়াছে, স্ব স্ব এলাকার মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকে তাহা হইলে তাহারা তাহাদের প্রাপ্য ও হিস্যা আদায় করিতে পারে সহজেই। সুতরাং ঐক্যবদ্ধ থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি এলাকার সবচাইতে বড় শক্তি হইল ঐক্য। এই মহাশক্তিকে নষ্ট করিবার জন্য নিজেদের মধ্যে ‘ঐক্য’ বিনষ্ট করাটাই যথেষ্ট। ইহার সহিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল জনগণকে শিক্ষিত করা। আগামী প্রজন্মকে সত্ নাগরিক হিসাবে গড়িয়া তুলিতে লেখাপড়ার বিকল্প নাই। শিক্ষার জন্য পিছিয়ে পড়া জনগণকে উদ্বুদ্ধ করিবার ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্বকেও বিশেষ দায়িত্ব লইতে হইবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে যেই ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে তাহার সদ্ব্যবহার করিয়া ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করা আবশ্যক। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের এই নাগরিকদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করিতে না পারিলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হইবে না। এই শিক্ষার সুযোগ যাহাতে ব্যাহত না হয়, ব্যবসায়-বাণিজ্য যাহাতে বন্ধ না হয় তাহার জন্য যে কোনো ধরনের অপচর্চা বর্জন করা আবশ্যক।
মনে রাখিতে হইবে, মহানবি রসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর তাহার কাজে কৌশলগত পরিবর্তন আনিয়াছিলেন, যেইখানে ছিল শান্তি ও ঐক্যের রাজনীতি। আমাদেরও সেই পথ অনুসরণ করিতে হইবে। শান্তি ও ঐক্যের রাজনীতির চর্চা করিতে হইবে। ইমান ও ধৈর্যের সহিত আমাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। স্বাধীনতার পূর্বের আক্রমণাত্মক হিংসামূলক যেই রাজনীতি ছিল তাহা স্বাধীন দেশে কোনো অবস্থাতেই কাম্য হইতে পারে না। সুতরাং ঘৃণা ছড়াইবার অভ্যাস ত্যাগ করা আবশ্যক। সুশিক্ষা, অহিংসা, ঐক্যই পারে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাইয়া দিতে। উন্নত ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করিবার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করিতে হয়। ইহার জন্য নিজেদেরকে মানসিকভাবেও প্রস্তুত করিতে হইবে।
