যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের প্রেসিডেন্সির সময়ে একটি কৌতুক শোনা যাইত বাক্সাধীনতা বিষয়ে। দুই বন্ধু বসিয়াছে গল্পে। একজন বলিলেন, আমার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে আমি প্রেসিডেন্টের সম্মুখে টেবিল চাপড়াইয়া সমালোচনা করিতে পারি। দ্বিতীয় জন সোভিয়েত নাগরিক সঙ্গে সঙ্গে বলিয়া উঠিলেন, আমার দেশেও এই স্বাধীনতা আছে। আমি জোর সমালোচনা করিতে পারি! প্রথম জন অবাক হইয়া বলিলেন, তাহা কী করিয়া সম্ভব!
দ্বিতীয় জন বলিলেন, আমি অবশ্যই আমার দেশে টেবিল চাপড়াইয়া জোর দিয়া বলিতে পারি, প্রেসিডেন্ট রিগ্যান তাহার দেশ সঠিকভাবে চালাইতে পারিতেছেন না! বাক্স্বাধীনতা লইয়া এই রসাত্মক বাক্যালাপ ক্ষেত্রবিশেষ বড়ই প্রাসঙ্গিক। যেইখানে বাক্স্বাধীনতা আছে, সেইখানে আছে। কিন্তু যেইখানে নাই, সেইখানকার মানুষ অনেক সময় বুঝিতেও পারে না যে তাহাদের বাক্স্বাধীনতা আছে কি নাই। তাহারা বাক্স্বাধীনতা কী তাহাও বুঝিতে পারে না। সেই কারণে তাহারা অনেক ক্ষেত্রে বাক্স্বাধীনতার যথার্থতাও বুঝিয়া উঠিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রেরই প্রতিষ্ঠাতাদের একজন বেনজামিন ফ্রাংকলিন বলিয়াছিলেন, মুক্তচিন্তা ছাড়া জ্ঞানের বিকাশ সম্ভব নহে, আর মুক্তচিন্তা বিকাশের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন বাক্স্বাধীনতা। সেই সঙ্গে এই কথাও বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রহিয়াছে যে, তোমার বলিবার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তুমি কী বলিবে সেই সম্পর্কে তোমাকে সচেতন থাকিতে হইবে এবং জানিতে হইবে। আবার কে কী বলিতেছেন সেই সম্পর্কে তাহার সঠিক ধারণা না থাকিলে তাহা মানুষের নিকট হাস্যকর হইয়া যাইতে পারে। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ জানেন এবং বলিতে পারেন তাহার নির্বাচনি এলাকার সঠিক পরিস্হিতি কী, কত টাকা খরচ করিয়া নির্বাচিত হইতে হয়, একজন প্রকৌশলী জানেন একটি সেতু নির্মাণ করিতে কত টাকা ব্যয় হইবে, একজন রসায়নবিদ জানেন, কোন কেমিক্যালের সহিত কোন কেমিক্যাল মিশিলে তাহার ফল কী। অন্য কেহ এই সম্পর্কে বলিতে পারেন, তবে অভিজ্ঞতা না-থাকা লোকের কথায় ভরসা থাকে কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা না-থাকা কাহারো বিবৃতি-উদ্ধৃতি মানুষের নিকট খেলো হইয়া উঠে। ইহা অভিজ্ঞতার বাহিরে কথা কহিবারই ফল। সুতরাং, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমানভিত্তিক কোনো কিছু কল্পনা করিয়া কাহারো কোনো কথা বলা উচিত নহে। আরেকটি খোলাসা করিয়া বলিলে সুবিধা হইবে। মাঝি কী করিয়া জানিবে একটি অ্যারোপ্লেনের মূল্য কত! মাঝি যদি বলিয়া দেন অ্যারোপ্লেনের মূল্য ১ লক্ষ টাকা, তাহা কি হাস্যকর হইবে না? সুতরাং চিন্তা করিতে হইবে বাস্তবতার আলোকে।
এক ব্যক্তি নূতন বাড়ি করিয়াছে। সেই বাড়িতে তিনি অত্যন্ত বিলাসবহুল আসবাবপত্র রাখিয়াছেন। ৩০ লক্ষ টাকা দিয়া রাজকীয় পালঙ্ক কিনিয়া সেই পালঙ্কে শুইয়া আরাম করিতেছেন। কিন্তু হঠাত্ করিয়া ভূমিকম্প হইল। আশপাশের বাড়িঘরগুলিতে হুড়াহুড়ি লাগিয়া গেল। নূতন বাড়ির মালিক দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাইয়া প্রায় নগ্ন অবস্হাতেই ছুটিয়া খোলা আকাশের নিচে অনেকের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলেন। অভাগা লোক বুঝিতেও পারেন নাই যে ভূমিকম্প হইতে পারে। সুতরাং জানিতে হইবে, আত্মতৃপ্তিরও একটি সীমাবদ্ধতা আছে। আর ইহাও মনে রাখিতে হইবে, ভবন যত ব্যয়বহুলই হউক, যত মজবুত করিয়াই তৈরি করা হউক, উহা অবিনশ্বর নহে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এইরূপ অসংগতিপূর্ণ আচরণ ও বক্তব্য দেখিতে পাই। যাহার দ্বারা যাহা সম্ভব নহে তাহা যেমন বলা উচিত নহে, তেমনি যাহার যেই কাজ করিবার ক্ষমতা নাই, সেই কাজ করিবার ওয়াদাও রাখা উচিত নহে। তাহাতে আপদ কেবল বাড়েই।
