অন্তর্নিহিত কারণও অনুসন্ধান করিতে হইবে

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ০৫:০৯

ব্যবসায় পরিচালনা এবং উত্পাদন কার্যক্রম সচল রাখিবার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমায় তাহা পরিশোধ করিবার বাধ্যবাধকতাও থাকে। প্রতিদিন পত্রপত্রিকা কিংবা যে কোনো সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখিলে আমরা দেখিতে পাই, দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। যাহারা ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করিতে পারিতেছেন না, তাহারা সকলেই যে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট বা চুরি করিতেছেন, এমনটিও ভাবিবার অবকাশ নাই। আমরা ঋণখেলাপি হইবার খবর পত্রপত্রিকায় দেখিতে পাই; কিন্তু কেন তাহারা খেলাপি হইতেছেন, কী কারণে তাহারা নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ পরিশোধ করিতে পারিতেছেন না, সেই বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা কিংবা অনুসন্ধান দেখিতে পাই না বলিলেই চলে।

গত দুই বত্সরেরও অধিক সময় ধরিয়া করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত সমগ্র বিশ্ব। করোনার ধাক্কা সামলাইয়া অর্থনীতি যখন ঘুরিয়া দাঁড়াইতে আরম্ভ করিতেছিল, সেই সময়ই বৈশ্বিক যুদ্ধ-পরিস্হিতি এবং ইহার প্রভাবে জ্বালানিসহ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচসহ মূল্যস্ফীতির কারণে আবারও অর্থনীতিতে স্হবিরতা নামিয়া আসিবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। যাহারা ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং উত্পাদনমুখী শিল্পকারখানা পরিচালনা করিয়া থাকেন, তাহাদের মোকাবিলা করিতে হইতেছে নানাবিধ প্রতিকূলতা। একদিকে মূল্যস্ফীতির খড়্গ, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যায় সক্ষমতা অনুযায়ী উত্পাদন ব্যাহত হইতেছে। ইহার পাশাপাশি শ্রমিকসংকট, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি—এই সকল সমস্যা তো রহিয়াছেই। দেশের কিংবা আন্তর্জাতিক যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক কিংবা সংকটে উত্পাদন কার্যক্রম, তথা পণ্য তৈরি ও বিক্রয় কার্যক্রমে অচলাবস্হা সৃষ্টি হইবার কারণে যাহারা ঋণের অর্থ সময়মতো পরিশোধ করিতে পারিতেছেন না তাহাদের ঋণখেলাপি ঘোষণা করিবার হুমকি আসে। অথচ কেন তাহাদের ঋণের অর্থ পরিশোধে বিলম্ব ঘটিয়া থাকে, ইহা লইয়া কোনো গবেষণা হয় না। দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা-প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে, রহিয়াছে বিভিন্ন এনজিও, তাহারা তো ইহা লইয়া রিসার্চ করিতে পারেন, অনুসন্ধান করিয়া যথাযথ কারণ খুঁজিয়া বাহির করিতে পারেন। ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তারা যেই সকল প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হইতেছেন তাহা বিস্তারিত গবেষণা করিয়া দেখা দরকার, ইহার বিহিত করাও জরুরি বইকি।

ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই, উন্নয়নশীল বিশ্বে ব্যাংকের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে লুটপাটকারী এবং অর্থপাচারকারীরা হাজার হাজার কোটি টাকা গায়েব করিয়া দিতেছে। পত্রপত্রিকা হইতে প্রায়শ জানা যায়, ১০ হইতে ১০০ কোটির বেশি টাকা লইয়া তাহারা লাপাত্তা হইয়া যাইতেছে। তাহাদের এহেন অপকর্ম দেখিয়া সাধারণ মানুষ হয়তো ভাবে, এইভাবে টাকাপয়সা উপার্জন করা যদি এতটাই সহজ হইয়া থাকে, তাহা হইলে পরিশ্রম করিবার কী দরকার! আবার সরকারি দল বলিয়া থাকে, দেশ সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে চলিতেছে; বিরোধী দল দাবি করিয়া থাকে, চুরি-লুটপাটে দেশের ত্রাহি অবস্হা। তাহারা বলিতেছেন বড়বড় প্রকল্প মানে বড়বড় চুরির ব্যবস্হা! আমাদের বুঝিতে হইবে এই সকল কর্মকাণ্ডের একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রহিয়াছে, যাহা ভবিষ্যতের জন্য কোনো সুখকর বার্তা বহিয়া আনিবার ইঙ্গিত দেয় না। তবে এই কথাও সত্য লুটপাটকারী ও অর্থপাচারকারীদের অস্তিত্ব কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, অর্থ পাচার হয় না এমন কোনো দেশ আজ খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। ইহা বৈশ্বিক সমস্যা বটে, তবে কেবল সমস্যার কথা বলিয়াই ক্ষান্ত দিলে চলিবে না, গবেষণা, অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ অব্যাহত রাখিতে হইবে। ইহার অন্তর্নিহিত কারণ উদ্ঘাটন করিয়া যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন