গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়াল। আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। গত বুধবার এই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলার ৩৭ সেন্টে উঠেছে। ২০১৪ সালের পর এত উচ্চতায় তেলের দাম আর কখনো ওঠেনি। করোনার পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম। আর তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য বাজারেও যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানি করে রাশিয়া। বিশ্বে প্রতি ১০ ব্যারেল তেলের এক ব্যারেলের জোগান আসে রাশিয়া থেকে। সেই সঙ্গে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে রাশিয়া। ইউরোপের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাসের জোগান আসে রাশিয়া থেকে। যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তার অভাব দেখা দেবে। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হবে বলে জ্বালানি তেলের দাম আপাতত আর কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ী মহল ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সহনীয় মাত্রার মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ভালো হলেও উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো নয়। এটা ক্ষতিকর। এর কারণ মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে মানুষ তার অর্জিত অর্থের দ্রুতই মূল্য হারিয়ে ফেলবে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে এমন ভোগ্যপণ্য এখনই কিনে ফেলতে চাইবে। এতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ আরো বেড়ে যাবে। অন্যদিকে পণ্যের উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং অনেক বেশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকার কারণে পণ্য উত্পাদকেরা উত্পাদন কমিয়ে দেবে এবং লোক ছাঁটাই করে বেশি মানুষকে বেকার করবে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সম্প্রতি প্রকাশিত যৌথ জরিপে জানা গেছে, করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র হওয়া মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ৩ কোটি ২৪ লাখ। সরকারি হিসাবেই করোনার আগে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল পৌনে ৪ কোটি। অর্থাত্, নতুন দরিদ্রসহ বর্তমানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে ৭ কোটি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় নিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সরকার যা-ই বলুক না কেন, এটা এখন খুব স্পষ্ট যে করোনার আগেই শ্লথ হয়ে আসা অর্থনীতি করোনার অভিঘাতে আরো অনেক খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি শ্লথ থাকা এবং বিদেশে কর্মরত অনেকেই তাঁদের সঞ্চয় দেশে পাঠানোর কারণে করোনার সময় দেশে ডলার রিজার্ভের বিরাট উল্লম্ফন হয়েছিল। করোনার প্রভাব কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশের টাকা আসার ক্ষেত্রে ভাটার টান পড়ায় এখন দেশে প্রতিদিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমছে, যার ফলে সরাসরি ভোক্তার কাছে যাওয়া আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আবার স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদিত পণ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো আমদানি করা পণ্য প্রয়োজন হয়, ফলে দাম বাড়ছে সেগুলোরও।
অর্থনৈতিক ধীরগতি, কর্মসংস্থানহীনতা, অতি দ্রুত কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া আর এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি এই নির্দেশনা দেয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি স্হবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সার্বিক পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলবে।
বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই ৫০ লাখ টন, যার মধ্যে ৪০ লাখ টন আমদানি করতে হয় আর মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশ আবার ব্যবহূত হয় পরিবহন খাতে। আর সেচকাজে ব্যবহূত হয় ১৬ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন করে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে আরেক দফা জনজীবনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে কৃষিতেও।
ধরা যাক, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খরচ বাড়বে বোরো আবাদে। দেশে মোট উত্পাদিত ধানের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। কারণ এর জন্য জমিতে ভূগর্ভস্হ সেচের পানি দিতে হয় শ্যালো টিউবওয়েল ও ডিপ টিউবওয়েল ব্যবহার করে। এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে ডিজেল প্রাপ্তির ওপর, যেখানে বিদু্যত্ বিতরণের ব্যবস্থা নেই। বিএডিসির সূত্রে জানা গেছে, দেশে মোট কৃষকের সংখ্যা ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮, অর্থ্যাত্ প্রায় ২ কোটি। এর মধ্যে সেচযন্ত্রের আওতায় ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭২ জন রয়েছে। শুধু ডিজেল সেচভুক্ত কৃষকের সংখ্যা হলো ১ কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার। বছরে সেচ বাবদ প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেলের প্রয়োজন পড়বে। দেশে গত অর্থবছরে প্রায় ১৬ লাখ সেচযন্ত্র পরিচালিত হয়েছিল। এর মধ্যে ডিজেলে চলেছে ১২ লাখ ৪৪ হাজার, বাকিগুলো বিদু্যতে পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। অর্থাত্, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম ৬৫ থেকে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছে। যদি আবার তা বাড়ে, তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে কৃষি খাতে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচকাজ ব্যাহত হবে এবং ধান উত্পাদন হ্রাস পাবে।
দেশে ধান ছাড়াও কৃষির অন্য খাতেও সেচযন্ত্রের বহুল ব্যবহার হয়। যেমন শীতকালীন সবজি, পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষে সেচযন্ত্রের ব্যবহার হয়। জমি চাষ থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছর শ্যালো মেশিনের ব্যবহার হয়। এসব যন্ত্র ডিজেলনির্ভর। শুধু ধান রোপণ বা চাষাবাদে নয়; মাড়াই, পরিবহনের কাজেও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহার করা হয়। সব মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে সব ধরনের কৃষিপণ্যের ওপরে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে অনেক কল-কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়ে। এমনিতেই আমাদের দেশে শিল্প কলকারখানায় জ্বালানির সংকট রয়েছে। এতে উত্পাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে নতুন করে উত্পাদনে যেতে পারছেন না। যারা উত্পাদনে আছেন, তারাও বিপদে আছেন। তারা ঠিকমতো গ্যাস-বিদু্যত্ পাচ্ছেন না। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অনেক সময় পেশার কম থাকে। অর্থাত্, জ্বালানির সংকটে নানাবিধ সমস্যায় রয়েছেন আমাদের শিল্প উদ্যোক্তাগণ। বিশ্ববাজারে নতুন করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের কপালে ভাঁজ পড়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমাদের আরো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা জরুরি এবং নতুন করে আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সংগত হবে না। ভতুর্কি দিয়ে হলেও বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
