নিয়ম মানিয়া চলিলে তদবির করিতে হইবে কেন?

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২২, ১০:৪৫

উন্নয়নশীল বিশ্বের সার্বিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভের মূলমন্ত্র হইল ডিসিপ্লিন ফার্স্ট বা শৃঙ্খলাই প্রথম। নিয়ম-শৃঙ্খলা না মানিয়া উন্নয়ন ও অগ্রগতির কোনো শর্টকাট পন্থা নাই। যে দেশ যত উন্নত, সেই দেশ আইনকানুন ও নিয়ম অনুসরণের ক্ষেত্রে তত অগ্রগামী। এই সকল কথা আমরা বহুবার লিখিয়া আসিতেছি, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাহার তেমন কোনো প্রতিফলন দেখিতেছি না। যে পর্যন্ত দেশে সর্বত্র শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত না হইবে, সেই পর্যন্ত আমাদের কোনো মুক্তি নাই। দেশে সর্বত্র তদবিরের প্রবণতা বাড়িয়া গিয়াছে। তদবিরে কাজ করিয়া দেওয়া হয় এমন বিজ্ঞাপন আমরা হরহামেশা পথেঘাটে-বাসে দেখিতে পাই। কী আশ্চর্য এক দেশ! এত তদবিরের লাইন কেন? চাকরি-বাকরি হইতে শুরু করিয়া সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ পাইতে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করাইতে প্রভৃতি ক্ষেত্রে তদবির ছাড়া যেন গত্যন্তর নাই। তদবিরের জন্য আমরা মামা-খালু হইতে শুরু করিয়া এমপি-মন্ত্রীর নিকট পর্যন্ত ছুটিয়া চলিয়াছি রুদ্ধশ্বাসে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ হইলে এবং সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হইলে এই তদবিরের যে কোনো প্রয়োজন পড়িত না, তাহা বলাই বাহুল্য।

কিছুদিন আগে সহযোগী একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হইয়াছে, ঝুলিয়া আছে ১১ লাখের অধিক নতুন ভোটারের আবেদন। এই সকল আবেদন ঝুলিয়া থাকিবে কেন? এই জন্যও কি তদবির করিতে হইবে বা আমাদের লিখিয়া কতৃ‌র্পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে হইবে? এই জন্য কতৃ‌র্পক্ষ হইল নির্বাচন কমিশন। নিশ্চয়ই এই কমিশন তাহার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে নাই। প্রতি বত্সর ভোটার তালিকা আপডেট করা কি তাহাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? ইহা যদি তাহাদের দায়িত্ব হয়, তাহা হইলে লক্ষ লক্ষ লোকের আবেদন কী করিয়া পড়িয়া থাকে? বর্তমানে যে নিয়ম আছে তাহা হইল, কেহ ভোটার হইতে চাহিলে তাহাকে নিজ উদ্যোগে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়গুলিতে গিয়া কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করিতে হইবে। সেই অনুযায়ী অনেকে আবেদন করিয়াছেন, এখন তাহা বিবেচনা করিয়া দেখা দরকার। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্যযোগ্য যে, এইভাবে ভোটার তালিকা তৈরি করা কতটা যুক্তিসম্মত তাহা নিয়াও আমাদের ভাবিয়া দেখিতে হইবে। পরীক্ষানিরীক্ষা না করিয়া কাহাকেও ভোটার বানানো যাইবে না। রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তভু‌র্ক্ত হইবার কথা আমাদের অজানা নহে। বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করিয়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে তাহাদের পাড়ি জমাইবার কথাও আমরা জানি। ইহা ছাড়া ভোটার তালিকায় ত্রুটি থাকিবার কথা বলিয়াই আমাদের দেশে ওয়ান-ইলেভেনের সৃষ্টি হইয়াছিল। তাই এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়। আবার দিনের পর দিন আবেদন ঝুলিয়া রাখিবার কোনো অর্থ নাই। ইহার আগে বাড়ি বাড়ি গিয়া তথ্য সংগ্রহ করিয়া যেইভাবে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হইত, সেই কর্মসূচি বন্ধ রহিয়াছে কেন? নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হইয়াছে। আমরা মনে করি, এই কমিশন দ্রুত এই বিষয়টি আমলে নিবেন।

দেশে জনসংখ্যা বাড়িতেছে। সেই অনুযায়ী নিয়মমাফিক ভোটারের সংখ্যা বাড়িবার কথা। তবে হালনাগাদ প্রক্রিয়া নিয়মিত করিবার পাশাপাশি এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। যতটুকু সম্ভব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকিয়া এই ধরনের কর্মপ্রচেষ্টা অব্যাহত রাখিতে হইবে। আমাদের মূল বক্তব্য হইল, সবাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে দায়িত্ব পালন করিলে তদবির করিতে হইবে কেন? কাজে কেন জট ও জটিলতার সৃষ্টি হইবে? ফাইল কেন টেবিলে পড়িয়া থাকিবে দিনের পর দিন? অতএব, আমাদের সর্বাগ্রে নিয়মকানুন রক্ষা ও শৃঙ্খলা মানিয়া কাজ করিবার ক্ষেত্রে সচেষ্ট থাকিতে হইবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন