ইউক্রেনে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে যে নাটকীয় ঘটনাবলী ঘটে চলেছে সেগুলোর অবশ্য বড়সড় টাইমস্কেল ও পশ্চাত্পদ রয়েছে। অনেকেই বলতে পারেন ‘রুশ আক্রমণ’ আসন্ন বলে আগামবার্তা প্রদানকারীদের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হলো। আবার অনেকেই বলতে পারেন, এর কোনো ভিত্তি নেই। গত চার পাঁচ মাস ধরে ‘রুশ আক্রমণ’ নামক শব্দবন্ধনী ঘিরে ভয়ানক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল।
এমনকি বাইডেন ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ‘রুশ আক্রমণ’ ঘটবে বলেন, ব্লিনকেনও একই দাবি করেন। যদিও তখন আক্রমণ ঘটেনি। রাশিয়া আসলে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে ইউরোপে সমন্বিত নিরাপত্তা চুক্তির চেষ্টা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো পাত্তা না দিলে মস্কো ‘টেকনিকেল-মেটিরিয়াল’ ব্যবস্হা নিতে বাধ্য হবে’র কথা জানিয়েও দিয়েছিল। (দেখুন: ‘যুদ্ধ হবে কি?’, ৫ ফেব্রুয়ারি, ইত্তেফাক)।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর থেকেই বৈশ্বিক রাজনীতির চেহারা বদলে যেতে থাকে। খোদ ইউরোপে-জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই যুগোস্লাভ ফেডারেশনকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়। পরাশক্তির অবাধ্য হওয়ার উদাহরণ হিসেবে চীনসহ ইরান, সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা, কিউবা, নিকারাগুয়া, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশগুলোর কথা বিশ্ববাসী জানে।
২০১৪ সালের ফেব্র‚য়ারি মাসে কিয়েভে যে মাইডান ক্যু সংঘটিত হয়— সেটি ছিল তিন দশকের ঘটমান ঘটনাবলীর একটি ছোট্ট সেগমেন্ট। এই ক্যুয়ের মাধ্যমে কিয়েভে চরমপন্থী অ্যান্টি রুশ প্লাস নিয়ো-নাত্সি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মিডিয়া অবশ্য পাবলিককে এই বিষয়টি কখনো বলেনি বলে না। (দেখুন: ‘একমেরু বনাম বহুমেরু’, মাওলা ব্রাদার্স)। ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্য হওয়ার এবং রাশিয়ার সীমান্তের অতি নিকটে পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার অনুরূপ মিসাইল সংস্হাপনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
দক্ষিণপূর্ব ইউক্রেনের ‘ডনবাস’ অঞ্চলের (‘লুগাননস’ ও ‘ডনেত্স’) অনেক নাগরিক এই কু্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরবর্তী আট বছর ধরে কিয়েভ ডনবাসের বিরুদ্ধে ‘অ্যান্টি-টেরর অপারেশনে’র মাধ্যমে নিমর্ম অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত ‘মিনস্ক শান্তিচুক্তি’র বাস্তবায়ন ইউক্রেনে কোনোদিন শুরু হয়নি। বরং গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ডনবাসে ইউক্রেন সেনাবাহিনীর নিয়ো-নাত্সি ‘আজভ ব্যাটালিয়ান’ মোতায়েন থাকে; এই ব্যাটালিয়নের সদস্যরা ইউনিফর্মে ‘এসএস ইনসিগনিয়া’ ও হলদে রঙের ‘সোয়াস্তিকা’ ব্যবহার করে। বিগত প্রায় আট বছর ধরে, তাদের গোলাবর্ষণে ডনবাসের অনেক অসামরিক মানুষ মারা গেছে, এবং মস্কোর ‘স্পেশাল অপারেশনে’র পূর্ব পর্যন্ত গোলাবর্ষণ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, সঙ্গে তীব্রতাও বৃদ্ধি পায়।
আপাতদৃষ্টে রুশদের ‘স্পেশাল অপারেশন’ ঢিমেতালে চলছে বলে মনে হতে পারে অনেকের; কিন্তু কোভিড-১৯ পিসিআর টেস্টের সর্বোচ্চ নির্ধারিত মেয়াদ যেখানে মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা, সেক্ষেত্রে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে ডিপ অপারেশন ও আরবান কমব্যাট সমাপ্তি হবে না বলে মনে করেন অনেকে। কেউ কেউ এখন মস্কোকে ড্রেসডেনের অবতারণার কথা বলছে। অনেকে অবশ্য মনে করেন, রুশরা ইউক্রেনকে ড্রেসডেনের মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চায় না; এমনকি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সঙ্গেও যুদ্ধ এড়াতে চায়, একমাত্র ব্যতিক্রম হলো : ‘খারকভ’, ‘মারিয়ুপল’, দক্ষিণপূর্বে অবস্হিত ডনবাসের নিয়ো-নাত্সি বাহিনী। এখানে উদ্দেশ্য হলো—ডিমিলিটারাইজেশন ও ডি-নাত্সিফিকেশন; এবং ইউক্রেনীয়রা নিরপেক্ষ ইউক্রেনের অধিকারী হোক। আপাতদৃষ্টে, খামোখা যুদ্ধ করে শক্তিক্ষয় না করার পন্থা হিসেবে রুশ বাহিনী কিয়েভ ও অন্যান্য বড়ো শহরগুলো অবরোধ করে রেখেছে বলে মনে করেন অনেকে। মনে হচ্ছে যে, জটিল ম্যাট্রিক্সকে বুঝতে না পারা পর্যন্ত রুশ ক্যাম্পেনের গতিময়তাকে অনুধাবন করা সহজ হবে না।
স্বাভাবিকভাবেই রুশ অপারেশনের কারণে সম্মিলিত পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ওপরে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছে। ইইউর বৈদেশিক মন্ত্রণাবিষয়ক প্রধান জোসেফ বরেলের প্রিয় ফ্রেইজ ‘ফুল-আউট প্রপাগান্ডা ওয়ার’ অনুযায়ী তিনি ‘রাশা টুডে (আরটি)’ ও ‘স্পুত্নিক’ সম্প্রচারকে নিষিদ্ধ করেছেন। তাছাড়াও, জাতীয় পর্যায়ে স্হানীয় ভাষায় পরিচালিত ওয়েবসাইট ‘ডাউন’ অবস্হায় রয়েছে; কোনো কোনো ওয়েবসাইট ‘ডিডিওএ’ ’ভুল ৫০২’, ‘ভুল ৪০৩’ ইত্যাদির খপ্পরে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে মিডিয়ার কি কোনো ভূমিকা রয়েছে? যদি থেকে থাকে তবে তা নিজেদের অডিয়েন্স তো বটেই আন্তর্জাতিক অডিয়েন্সও সামগ্রিক তথ্যাদি থেকে বঞ্চিত রাখছে, পাবলিক ডিবেইট অনুপস্হিত। তাছাড়াও, ‘ফগ অব ওয়ার’-এর আবরণ এখনো বিদ্যমান।
সম্মিলিত পশ্চিমের মূলধারার মিডিয়া বিবিসি, সিবিএস, ডেইলি টেলিগ্রাফ, আইটিভি, আল-জাজিরা ইত্যাদির মতো সুপরিচিত মিডিয়ার ভূমিকা অনেক কিছুর মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসমেত সম্মিলিত পশ্চিম নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাশিয়াকে জব্দ করার নানা রকম ব্যবস্হা নিয়েছে, সেগুলোর একটি হলো ‘সুইফট’-এর দরজা বন্ধ করে দেওয়া। তবে এর সমস্যাও অনেক। যেমন এর ফলে ডলারের ‘ডি-ডলারাইজেশন’ কি ত্বরান্বিত হতে পারে। কারণ, ‘সুইফট’-এর বিকল্প হিসেবে রুশদের রয়েছে ‘এসপিএফএস’ (সিস্টেম ফর ট্রান্সফার অব ফাইনেন্সিয়াল মেসেজেস) এবং চীনের রয়েছে ‘সিআইপিএস’ (ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম) সিস্টেম। তদুপরি, ‘ডলার’কে নিষেধাজ্ঞা নামক শাস্তি প্রদানের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতায় অনেক দেশই, যেমন গ্লোবাল সাউথ, সদাভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকে, সেসব দেশ ‘সুইফট’-এর বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তবে আগ্রহী পাঠকরা গুগল করে মাইকেল হাডসনের ‘আমেরিকা ডিফিটস জার্মানি ফর দি থার্ড টাইম ইন এ সেনচুরি’ পড়ে দেখতে পারেন।
তবে পরাশক্তিদের এই টানাপড়েনে কমবেশি ভুগবে সারা বিশ্বই। নগর পুড়লে দেবালয় তো এড়ায় না। প্রবাদেই আছে।
লেখক: চেক রিপাবলিক প্রবাসী সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
