ইউক্রেনের ন্যাটোভুক্তির সম্ভাবনা কতটুকু

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৩:৩০

আজ ইউক্রেন যুদ্ধের দ্বাদশ দিন। অনেকে ভেবেছিলেন রাশিয়া দুই-তিন দিনের মধ্যে ইউক্রেন দখল করে নিবে; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। ইউক্রেনের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। ইউক্রেনের যেসব নাগরিক প্রবাসে বসবাস করেন, তাদেরও অনেকে মাতৃভূমি রক্ষায় দলে দলে দেশে ফিরে আসছেন। এই যুদ্ধে প্রতিদিনই ইউক্রেনবাসীর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়ও হামলা চালানো হচ্ছে এবং অনেক বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশু হতাহত হচ্ছেন। রাশিয়ার এই হামলার শুরুতেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি আবেগময়ী ভাষণ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের পথ সুগম হয়েছে।

শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ নয়, ইউক্রেনের ন্যাটোভুক্তির পথ কতদূর? ইউক্রেন ন্যাটো সদস্য হতে যাচ্ছে বা হতে পারে, মূলত একে কেন্দ্র করেই এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে। তাই ইউক্রেনের ন্যাটোভুক্তির বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ। আমরা জানি, ১৯৯০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভ করে। ইউক্রেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। তাই সে ন্যাটো সদস্যভুক্ত হবে কি না—এ ব্যাপারে তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে।

বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইউক্রেন প্রসঙ্গে রাশিয়া ও পশ্চিমের শক্তিদের মধ্যে চলমান অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা জোট ন্যাটো। ইউক্রেনে দুইটি রাজনৈতিক ধারা প্রবল। একটি ধারা পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দেওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হতে আগ্রহী। অপর ধারাটি এর বিপরীত। তারা রাশিয়ার বলয়ে থাকতে চায়। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দুটো এলাকা—লুহানস্ক ও দোনেত্স্কে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনে রুশ সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এতে পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা রাশিয়ার ওপর নতুন করে নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এর আগে ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের একটি অংশ ক্রাইমিয়া দখল করার জন্য সেখানে সৈন্য পাঠায়। ঐ সময় যুদ্ধ বন্ধে একটি আন্তর্জাতিক মিনস্ক শান্িত চুক্তি হয়েছিল; কিন্তু লড়াই তাতে থামেনি। ইউক্রেনে রাশিয়ার পদক্ষেপে অবরোধ আরোপ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। জাতিসংঘ বলছে, এটি ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। অনেক বিশ্লেষক অবশ্য বর্তমান সংকটকে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ১৯৬২ সালের সেই সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় একটি পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্েত চলে এসেছিল।

ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর সামরিক বাহিনী একেবারে রাশিয়ার সন্নিকটে এসে যাবে। নিজের দোরগোড়ায় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতিকে রাশিয়া অস্বস্তিকর বা নিরাপত্তাগত হুমকি বিবেচনা করে। ইউরোপে ইউক্রেন হচ্ছে রাশিয়ার প্রবেশ দ্বার। কাজেই ইউক্রেন যদি রাশিয়ার প্রভাব-বলয়ের বাইরে চলে যায়, সেক্ষেত্রে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহসহ ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অনেক সমীকরণে রাশিয়ার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়; কিন্তু ইউক্রেনের মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্িতত। যেহেতু তারা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হয়েছে এবং ইউক্রেনের একাংশ ক্রাইমিয়াকে ইতিমধ্যে জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে রাশিয়া, তাই তারাও সন্দেহমুক্ত হতে পারছে না।

এদিকে ন্যাটোর মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো ‘রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগের মাধ্যমে জোটের সব সদস্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’ জোটের সবচেয়ে পরিচিত দিক হলো চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের মূলকথা, ‘এক মিত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ সমস্ত মিত্রদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হয়’। এখনো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য নয় ইউক্রেন। তবে দেশটি ন্যাটোর সদস্য হতে চায় বহু দিন ধরে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলছেন, ন্যাটো ছাড়া কোনো পথ নেই ইউক্রেনের। ন্যাটোর সদস্য পদ তার দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ইউক্রেন যে ন্যাটোর সদস্য হতে চায়, তা সংবিধানেই লেখা রয়েছে। বিষয়টি মানতে নারাজ রাশিয়া। এ কারণে রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে এমন নিশ্চয়তা চায় যে, ইউক্রেনকে কখনো ন্যাটোর সদস্য করা হবে না। রাশিয়ার চাওয়া অনুযায়ী, এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা দিতে রাজি নয় পশ্চিমা দেশগুলো।

রাশিয়া বহুদিন ধরে অভিযোগ করে যাচ্ছে যে, ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো জোটকে পূর্বদিকে সম্প্রসারণ করা হবে না বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে কথা তারা রাখেনি। তবে ন্যাটো রাশিয়ার এই কথা প্রত্যাখ্যান করেছে।

পুতিন মনে করেন, রাশিয়াকে চার দিক থেকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলো ন্যাটোকে ব্যবহার করছে। ইউক্রেনকেও এ উদ্দেশ্যে ন্যাটোতে নেওয়া হতে পারে। এ কারণে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছেন তিনি। কারণ রাশিয়া এখন বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক জোটের সঙ্গে স্থল সীমানা ভাগ করছে। এভাবে মস্কোর ভূ-রাজনৈতিক শক্তি কমে আসছে। তাই রাশিয়ার চাওয়া, ১৯৯৭ সালের পর যেসব দেশ ন্যাটোর সদস্য হয়েছে, সেসব দেশ থেকে সৈন্য এবং সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে হবে। এর মানে হলো, মধ্য ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ এবং বালটিক সাগরের তীরের দেশগুলো থেকে ন্যাটোর সৈন্যদের সরাতে হবে। তবে ন্যাটো জানিয়েছে, বালটিক দেশগুলোয় অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করবে।

অবশ্য ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের বিরুদ্ধে ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করাসহ সংঘর্ষে জড়াতে ইচ্ছুক নয় ন্যাটো জোট। ইউক্রেনের ভূখণ্ডেও ন্যাটো সেনা পাঠাবে না। ন্যাটো মনে করে, তাদের সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে। এতে করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি রয়েছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং এতে বৈশ্বিক মেরুকরণ আরো স্পষ্ট হয়েছে; কিন্তু সামরিক জোট ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা অনেক জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে সীমাবদ্ধ বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন