বঙ্গবন্ধু: বাঙালি জাতিসত্তার প্রধান শিকড়

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৩:১৩

কিছু মানুষ থাকেন যারা ইতিহাসে উদ্ধৃত হন, কেউ কেউ আছেন যারা ইতিহাসের অংশ হয়ে যান; আর এমন সামান্য কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেরাই ইতিহাসের স্রষ্টা হয়ে যান। বঙ্গবন্ধু এই শেষোক্ত পর্যায়েরই মানুষ। যাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে ইতিহাস, সৃষ্টি হয়েছে গাঙ্গেয় বদ্বীপের একটি বিশাল জাতির জন্মগাথা। এই একটি মানুষ যার কর্মজীবনের প্রতিটি স্তরে রচিত হয়েছে এক মহান মুক্তিসংগ্রামের অমর পঙ্ক্তিমালা। বাঙালির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে কখনো তার আত্মপরিচয়ের সন্ধান ছিল না, কখনো তার আত্মপরিচয়ের ইতিহাস ছিল না। এই মহান মানুষটি এই জাতির অপ্রাপ্তির যাতনার অবসান ঘটিয়েছেন। এখন বাঙালি জাতির একটা ঠিকানা আছে, একটা জাতীয় সংগীত আছে, একটা পতাকা আছে, একটা স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড আছে। এসব কিছুর পেছনে যার অখণ্ড অবদান, তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিশ্বনন্দিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আমরা ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রনায়কের রাষ্ট্র পরিচালনার কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক কাহিনি শুনেছি। পাঠ করেছি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের নানা ধরনের নির্দেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনবদ্য ভূমিকা সমস্ত তুলনার ঊর্ধ্বে। আমরা এমন একটা সময় নিয়ে আলোচনা করছি যে সময়টা একটি নতুন জাতির আবির্ভাবের পূর্বক্ষণ, একটি রাষ্ট্রব্যবস্হার মধ্যে নতুন শক্তির স্ফুরণের লগ্ন। পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্হার অচলায়তন চূর্ণবিচূর্ণ করে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের অসমসাহসী সন্ধিক্ষণ। ঠিক সেই মুহূর্তে অত্যন্ত নির্মোহভাবে যিনি নির্ণয় করতে পারেন ইতিহাসের গতিমুখ, তাকে আমরা কোন অভিধায় অভিষিক্ত করব? তিনি তো মানুষের সাধারণ গুণাবলির আরো ঊর্ধ্বে অসাধারণ মহিমায় উদ্ভাসিত এক মহামানব। যিনি সেই উত্তাল সময়ে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের অনবদ্য এক ভাষণের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিমুখ নির্ণয় করলেন। যার ধারাবাহিকতায় বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের অভু্যদয় ঘটল।

বাঙালির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা ৭ই মার্চ অবিস্মরণীয় একটি দিন। বাঙালি জাতির চরম ক্রান্িতকালে এদিন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল জনসমুদ্রে সভামঞ্চে ‘রাজনীতির কবি’ বঙ্গবন্ধু ‘দুঃখ ভারাক্রান্ত হূদয়’ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন ১০ লক্ষাধিক মানুষের সামনে পাকিস্তানি দসু্যদের কামান-বন্দুক-মেশিনগানকে পরোয়া না করে বজ্রকণ্ঠে বাঙালি জাতির হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও মুক্তির দাবি আদায়ের ঘোষণা করলেন। এই একটি ভাষণই বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়, যা বিশ্বের ইতিহাসে একটি অনন্য নজিরবিহীন ঘটনা।

মাত্র ১৯ মিনিটের এক ভাষণ যেটি বিশ্ববাসীর কাছে বিশেষ করে বিশ্বের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের কাছে এক আলোর দিশারি। বঙ্গবন্ধু তার সংক্ষিপ্ত সেই তেজস্বী ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতি ও বাঙালির বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালির দ্বন্দ্বের স্বরূপ উপস্হাপন করেন, অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেন, শান্িতপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানে তার সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথাও ব্যক্ত করেন, পূর্ব বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি জানতেন এই প্রতিরোধ সংগ্রামই শেষাবধি মুক্তিযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করবে। তাই তিনি শত্রুর মোকাবিলায় গেরিলাযুদ্ধের কৌশল অবলম্বনের কথাও বললেন তার ভাষণে। যে কোনো উসকানির মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পরামর্শ দানসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার পর ঘোষণা করলেন :‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ।...এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

রেসকোর্সের জনসমুদ্রে দেওয়া জাতির পিতার এই কালজয়ী ভাষণেই ধ্বনিত হয়েছিল বাংলার গণমানুষের প্রাণের দাবি। বঙ্গবন্ধু তার এই ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ করেন। একই সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকনির্দেশনাও দিয়ে যান। ২ মার্চের ডাকে ৭ই মার্চ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পাওয়ার জন্য জনসমুদ্রের ঢেউ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে ধাবিত হতে থাকে। তিনি তাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্য নির্দেশ দেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতারই ঘোষণা। তবে সরাসরি তা ঘোষণা না করে তিনি কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই ভাষণই নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে রাতারাতি সশস্ত্র করে তোলে। একটি ভাষণকে অবলম্বন করে স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ বাঙালি জীবন উত্সর্গ ও কয়েক লাখ মা-বোন সম্ভম বিসর্জন দেন। বিশেষত ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি ‘স্বাধীনতার’ কথা এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যাতে স্বাধীনতা ঘোষণার কিছু বাকিও থাকল না; আবার তার বিরুদ্ধে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার অভিযোগ উত্থাপন করাও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্হিতি এমন ছিল যে, কোনো কোনো বিদেশি পত্রিকাও তখন জানিয়েছিল, ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। একাত্তরের ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার এবং ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সে সময় ৭ই মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। একাত্তরের ৬ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয়, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।’ আমরা দেখেছি পরবর্তীকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু একাত্তরে ৭ই মার্চ সরাসরি কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, তার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিয়েছেন। ১৯৭২-এর ১৮ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে এনডব্লিউ টিভির জন্য দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭ই মার্চের ঐ ঘটনা বর্ণনা করেন। ফ্রস্ট জাতির পিতার কাছে জানতে চান, ‘আপনার কি ইচ্ছা ছিল যে, তখন ৭ই মার্চ রেসকোর্সে আপনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেবেন?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে এবং সভায় আমি ঘোষণা করি যে এবারের সংগ্রাম মুক্তির, শৃঙ্খল মোচন এবং স্বাধীনতার।’ ফ্রস্ট আবার প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যদি বলতেন, আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা করছি, তো কী ঘটত?’ বঙ্গবন্ধু উত্তর দেন, ‘বিশেষ করে ঐ দিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে তাদের আমি এটা বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। আমি চাইছিলাম তারাই আগে আঘাত হানুক এবং জনগণ তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।’ পরবর্তীকালে পুরো বিশ্ব জানল, ৭ই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শতভাগ সঠিক কাজটিই করেছেন।

জাতির জনকের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনেসকোর মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রের ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়ে এর মাহাত্ম্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্র্রতি জেকোভ এফ ফিল্ডের গ্রন্থে প্রায় আড়াই হাজার বছরে মানবজাতির ইতিহাসে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নেতা, রাষ্ট্রনায়ক ও মিলিটারি জেনারেলদের উদ্দীপনামূলক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ অন্তভু‌র্ক্ত হয়েছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। তার বিবেচনায় বিশ্বে শ্রেষ্ঠ ৪০টি ভাষণ এতে সংকলিত হয়েছে। আমরা দেখেছি, নিউজ উইক সাময়িকী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এছাড়া ইউনেসকোর স্বীকৃতির আগেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় একাডেমিক স্বীকৃতি পায়। এসব তথ্যই পরিষ্কারভাবে ৭ই মার্চের মাহাত্ম্যকেই তুলে ধরে।

রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও বহু ত্যাগের বিনিমিয়ে আমরা ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। একটি ভাষণ কীভাবে গোটা জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে; স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উত্সাহিত করতে পারে; বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

লেখক: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন