সাইফুল ইসলাম জুয়েল
খান সাহেবরা এখনো বাংলাদেশের সাবেক রাজা-বাদশাহদের ন্যায় গদিযুক্ত আসন দখল করে আছে!
কথাটা কারোর বিশ্বাস না হলে সোজা বাজারে চলে যাবেন। অধিকাংশ দোকানেই দেখবেন দোকানদারগণ একটা গদি বিছিয়ে তাতে আরাম করে বসে আছে!
তাদের অনেকেরই বসে থাকার স্টাইল কোনো অংশে রাজার থেকে কম নয়। আর আচরণ? সেটাতে তো তারা এক কাঠি বেশি সরেস!
দোকান থেকে দুই টাকার পণ্য কিনে আপনি যদি একশ টাকার নোট বাড়িয়ে দেন, তাহলে আপনি তাদের জেনুইন প্রজা। রাজা-বাদশাহদেরর মতোই ‘তাচ্ছিল্য’ ভাব দেখাবে তারা আপনার সঙ্গে। আর আপনি যদি ৯৮ টাকার পণ্য কিনে ১০০ টাকার নোট গুঁজে দেন, তাহলে এই অমিয় বাণী শুনতে পাবেন, ‘ভাংতি নাই?’
তখন হয়তো আপনার মনে হবে—তাদের ভাংতি দেওয়ার জন্য ভিক্ষা করতে হবে কিংবা তাদের থেকে ভাংতি নিয়ে সর্বক্ষণ সঙ্গে রাখতে হবে। কেননা, স্বয়ং ব্যাংকেও যে এখন প্রায় সময়ই ভাংতি মিলে না। সেখানেও সেই একই কথাই শুনতে হয়, ‘ভাংতি নাই?’
বন্ধু মাহমুদ সেদিন শোনাল আরেক মজার ঘটনা। বেচারা ৪৯০ টাকার পণ্য কিনে ৫০০ টাকার নোট দেওয়ার পরে খান সাহেব থুড়ি দোকানি তাকে বলল, ‘ভাংতি নাই?’
মাহমুদ অবাক হয়ে বলল, ‘মাত্র তো দশ টাকা ফেরত দেবেন!’
‘সেটাই। ভাংতি থাকলে দিন না! বড় উপকার হয়।’
মাহমুদের দয়ার শরীর। সে পুরো ৪৯০ টাকাই ভাংতি দিল দোকানিকে।
অন্য একটা কাজে পাশের দোকানে গিয়ে দাঁড়ানোর পর বেচারা খেয়াল করল, আরেকজন এসে ৯০ টাকার পণ্য কিনেছে। সে একশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলে তাকেও দোকানি একই কথা বলছে, ‘ভাংতি নাই?’
সেই বেচারারও মাহমুদের মতোই হতবাক। তবে সে বোধহয় দোকানির থেকেও বেশি সরেস। মাথা চুলকিয়ে এমন একটা ভাব করল, তারপর বিশ টাকার আরেকটা পণ্য কিনে ১১০ টাকা বিল বানিয়ে সেই ১০০ টাকার নোটটা ফিরিয়ে দিয়ে দোকানিকে ৫০০ টাকার একটা নোট গুঁজে দিল।
দোকানি মুখখানা পাংশুটে বর্ণ করে ঠিকই গুণে গুণে ৩৯০ টাকা ফিরিয়ে দিল তাকে।
মাহমুদের মেজাজখানা তখন সপ্ত আসমানে চড়েছে। সে একটু পরে সেই দোকানে ফিরে এসে কাতর স্বরে বলল, ‘দুঃখিত, জিনিসগুলো ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে! আমার বাবাও নাকি একই জিনিস কিনে নিয়ে গেছে।’
দোকানি মুখ গোমড়া করে ক্যাশ থেকে মাহমুদকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে বলল, ‘দশ টাকা ভাংতি দিন?’
মাহমুদ বলল, ‘নাই। একটু আগেই না আমি আপনাকে ৪৯০ টাকা দিয়ে গেলাম? সেই টাকাটা দিন।’
দোকানি বোধহয় জাদু জানে, সে ঠিকই গুণে গুণে মাহমুদকে ৪৯০ টাকা ফিরিয়ে দিল।
মাহমুদের দোকানিকে খুব করে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করল, ‘এখন খুচরা টাকাগুলো কোত্থেকে বের হচ্ছে?’
কিন্তু সে আর কোনো বাক্যব্যয় না করে ফিরে এল। খান সাহেবদের বেশি কিছু জিজ্ঞেস করতে নেই।
দুই.
আব্বুর এক বন্ধু কোনো একটা বেসরকারি ব্যাংকের এমডি। সেদিন আব্বু আঙ্কেলকে সপরিবারে দাওয়াত দিলেন। বন্ধুস্থানীয় হলেও তাঁরা একে অপরকে আপনি সম্বোধন করেন।
আঙ্কেল কিচ্ছু খাচ্ছেন না দেখেই বোধহয়, আব্বু হঠাত্ খাওয়ার মাঝে বলে উঠলেন, ‘এমডি খান!’ এর একটু আগেই তাঁর সামনে একটা আস্ত মুরগির রোস্ট এগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেখান থেকে খেয়েও ছিলেন কিছুটা। তাই তিনি জবাব দিলেন, ‘খেয়েছি তো!’
আব্বু ফের বললেন, ‘খান খান!’
আঙ্কেল এবার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আর কত খাব?’
আব্বু কেন জানি হঠাত্ চমকে উঠলেন। শেষে মুচকি হেসে বললেন, ‘আরে আমি আপনাকে খেতে বলছি না তো! আপনার নাম ধরে ডাকছি! হঠাত্ একটা কথা মনে পড়েছে, শুনুন...’
এতক্ষণে আমার মনে পড়ল—আংকেলের নাম জাবেদ খান!
তিন.
জাবেদ খান খেলেও ওয়াসার সেই খান সাহেব—পাঠান মুঘলে আজম শের খান খেলেন না। ইনি ওয়াসার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি কী খেলেন না, সেই ঘটনায় একটু পরে আসি। তার আগে অন্য কিছু বিষয় বলে নিই।
ক’দিন ধরেই ওয়াসার পানির দুর্গন্ধে টেকা দায়। সেদিন পত্রিকায় দেখি—খান সাহেব নাকি বলেছেন, ওয়াসার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ। যে কেউ খেতে পারবে। যদিও তিনি তিন ধরনের পানি খান।
এই বক্তব্যে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। প্রতিক্রিয়াকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমত, এতদিন যারা ওয়াসার পানি জারে করে বাড়িতে হোটেলে বিক্রি করত, তাদের এখন পথে বসার জোগাড় হলো। বিশুদ্ধ পানি বাসায় পাওয়া গেলে লোকজন তা কিনতে যাবে কোন দুঃখে!
দ্বিতীয়ত, যেসব কোম্পানি ওয়াটার পিউরিফাইয়িং মেশিন বিক্রি করে তাদের এখন ব্যবসা লাটে ওঠার দশা!
তৃতীয়ত, কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তার খোঁজ মিলল। তারা নাকি পানির কোম্পানি খুলবে। বিশুদ্ধ পানি তো ওয়াসা থেকেই মিলবে। এখন কেবল বোতলজাত আর বাজারজাত করাই বাকি! তবে, তাদের মনে ভয়ও আছে—এরপর থেকে পাবলিক পানি কিনে খাবে তো? অবশ্য পাবলিক পানির বোতল না কিনলে, তারা বোতল-পানি বিদেশে রপ্তানি করবে বলে ভেবে রেখেছে।
তবে, শেষের খবরটা বেশ চিন্তার উদ্রেককারী। সরাসরি লাইনের পানি খেয়ে অনেকেই নাকি পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন!
এবার আসি খান সাহেবের মূল ঘটনায়। আমাদের এক নিকটাত্মীয় মিতু আপুর বর তিনি। টিআইবি গত ১৭ এপ্রিল একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছিল, ওয়াসার পানি এমনিতে মুখে দেওয়া যায় না। ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে খান। বাসাবাড়িতে পানি ফোটাতে বছরে ৩৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার ঘনমিটার গ্যাস পোড়াতে হয়।
ওয়াসার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ—বরের মুখ থেকে একথাটা জানার পর মিতু আপু আর বাসায় পানি ফোটান না। এমনকি বাসায় বোতলজাত ‘শান্তি’ও আনতে নিষেধ করে দিয়েছেন!
পানি ফোটানো হচ্ছে না—এই কথাটা খান দুলাভাইয়ের জানতে একদিন সময় লাগল। যখন জানতে পারলেন, তখন বমি করতে করতেই তাঁর অবস্থা হালুয়া-টাইট!
মিতু আপুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পানি বিশুদ্ধ শোনা মাত্রই ফোটানো বন্ধ করে দেবে?’
‘কেন দেব না? পানি বিশুদ্ধ হলে শুধু শুধু গ্যাস নষ্ট করব কেন!’
‘আরে ওটা তো অন্যদের জন্য। আমাদের জন্য নয়।’
মিতু আপু থ’ মেরে গেলেন।
সেদিন রাতে খান দুলাভাইয়ের বাবা তাঁদের বাসায় বেড়াতে এলেন। এসেই মিতু আপুকে হাঁক ছেড়ে বললেন, ‘কই বউমা, বাসায় চিনি আছে তো?’
‘আছে, বাবা।’
‘বেশ, তাহলে জগ-গ্লাস নিয়ে আসো।’ এই বলে তিনি তাঁর পকেট থেকে চারটা প্রমাণ সাইজের লেবু বের করলেন। ‘আজ অনেকদিন বাদে বাজারে দেশি লেবু পেলাম। ভাবলাম—আমাদের পাঠান মুঘলে আজম শের খান যেহেতু লেবুর শরবত পছন্দ করে, ওকে নিয়েই খাই!’
খান সাহেব দুলাভাই লেবুর শরবতের কথা শুনে দ্রুতপদে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু একটু পরেই তাঁর মনে পড়ল—বাসায় ‘বিশুদ্ধ’ পানি নেই! ফোটানো পানি এখনো ঠাণ্ডা হয়নি। অফিসে ফোন করলেও এখনো ‘শান্তি’ এসে পৌঁছায়নি।
বাবার বাড়িয়ে দেওয়া লেবুর শরবতের গ্লাসটির দিকে তিনি ভয়ার্তদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন!
বাবা যে রাগী মানুষ! তিনি যদি শোনেন যে তাঁর বলা ‘ওয়াসার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ’ কথাটা শতভাগ ভুয়া, তাহলে হয়তো চিবিয়েই খেয়ে ফেলবেন।
খান দুলাভাই লেবুর শরবতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। খেলেন না তিনি। মিনমিন করে বললেন, ‘এই চিনি ভেজালে ভরা। একটু আগেই টিভিতে দেখলাম। ভেজাল চিনি দিয়ে বানানো লেবুর শরবত খাওয়া যাবে না বাবা। পেট খারাপ হবে! তারচেয়ে চলো আজ গরম ভাতে দেশি লেবু মাখিয়ে মজা করে খাই!’
