নারীর জীবনে অন্যতম একটি আনন্দময় ঘটনা মা হওয়া। হরমোনের তারতম্যের কারণে, মা হওয়ার পরে একটু মন-মেজাজের পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। অনেকেই বাচ্চা জন্মের পর সাধারণত স্ট্রেস, দুঃখিত, উদ্বিগ্ন, একাকী কিংবা ক্লান্িত বোধ করতে পারেন। তবে কিছু নারী, আরো অনেক মারাত্মক মনখারাপ অনুভব করেন, যাকে সাধারণত প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন বলে। এই ধরনের ডিপ্রেশন সাধারণত শিশু প্রসবের কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পরেও হতে পারে। এই রোগকে অনেকেই জিন-ভূতের আছড় বলে মনে করেন। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে এটি জিন-ভূতের আছড় হিসেবে বেশি প্রচলিত। এসব রোগীকে ট্র্যাডিশনাল কবিরাজ, ওঝা, পির-ফকিরের কাছে নেওয়ার কারণে মানসিকভাবে আরো নির্যাতিত হতে হয়। তবে বর্তমানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে এটি জিন-ভূতের আছড় নয় বরং ডিপ্রেশন জাতীয় মানসিক সমস্যা।
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনের সঠিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই রোগ যে কোনো ধরনের মাকেই প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি সাত জনে এক জন মা এই প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন এবং যারা এই রোগে আক্রান্ত হন, তাদের অর্ধেকেরই আগে কোনো ডিপ্রেশনের হিস্ট্রি পাওয়া যায় না। এই ডিপ্রেশন নিজে থেকে ভালো হয় না। যদি চিকিৎসা করা না যায়, তাহলে বেশ কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী চলতে পারে। দিনের পর দিন ডিপ্রেশন কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং এই ডিপ্রেশনের কারণে বাচ্চা বা নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলি ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে আলাদা হলেও, সবার জন্য নিচের লক্ষণগুলোর কয়েকটি থাকতে পারে। দিনের বেশির ভাগ সময়ে অকারণে মনখারাপ থাকা বা দীর্ঘ সময়ে অকারণে কান্নাকাটি করা, হতাশ, বিরক্তি, অস্থিরতা এমনকি সবকিছু খালি খালি অনুভব হওয়া, যে জিনিসগুলি উপভোগ করত, সেগুলিতে আনন্দ বা আগ্রহের অভাব বোধ হওয়া, ক্ষুধার পরিমাণ অত্যধিক বেড়ে বা কমে যাওয়া, নিজেকে অপরাধী বা দোষী ভাবা বা ক্রমাগত নিজেকেই দায়ী মনে করা, অত্যধিক বিরক্তি বা ক্রোধ বা রাগ অনুভব করা, ভালো মা না হতে পারার ভয় কাজ করা, খুব বেশি ঘুমানো বা ঘুমাতে সমস্যা হওয়া, শিশু, পরিবার এবং বন্ধুদের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, কাজকর্মে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হওয়া বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা, নিজেই বাচ্চাকে আঘাত করার পরিকল্পনা করা ইত্যাদি।
প্রসব-পরবর্তী ডিপ্রেশন একটি সাধারণ ও চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা করতে পারলে রোগী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করেন এবং স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবন যাপন করেন। এই লক্ষণগুলো দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, আপনার প্রফেশনাল সহায়তা প্রয়োজন। আপনার প্রিয়জন প্রসব-পরবর্তী ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হলে দ্রুত কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রফেশনাল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সহায়তা নিন। লক্ষণগুলো খুব অল্প সময়ের জন্য হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে লক্ষণগুলো মৃদু বা তীব্র যা-ই হোক, সঠিক চিকিৎসা দ্বারা পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব।
এই ডিপ্রেশন কমাতে আপনার অনুভূতি সম্পর্কে সঙ্গী, অন্যান্য বাচ্চার মা, বন্ধু এবং আত্মীয়দের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন, মায়েদের গ্রুপে যোগদান করে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার বাচ্চার দেখাশোনার জন্য পরিবার বা আত্মীয়স্বজনদের সহায়তা নিন। বাচ্চাকে সহায়তাকারীর কাছে রেখে যতটা সম্ভব ঘুমিয়ে নিন। কম গুরুত্বহীন কাজ নিয়ে ভাবনা বাদ দিন, প্রয়োজনে নিজের দায়িত্ব কমিয়ে নিন। নিজের জীবন সম্পর্কে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করুন। চিকিত্সকের পরামর্শে হালকা ব্যায়াম করুন। দিনের একটা সময়ে ৩০-৪০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকুন। প্রফেশনাল মানসিক সহায়তা নিন। কোনো প্রফেশনাল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে কগনিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপি, ডাইলেকটিভ বিহেবিয়ার থেরাপি (ডিস্ট্রেস টলারেন্স, ইমোশনাল রেগুলেশন ও মাইন্ডফুলনেস) এই ধরনের চিকিৎসা ডিপ্রেশন কমাতে খুব হেল্পফুল। তবে প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনের পরিমাণ খুব বেশি হলে মেডিসিনেরও প্রয়োজন হতে পারে।
লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
