নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ দমন 

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ১০:৩০

স্যার থমাস পেইন ১৭৮৯ সালে সর্বপ্রথম নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ‘Rights of Man’ (পুরুষের অধিকার)-এর স্থলে ‘Human Rights’ (মানবাধিকার) কথাটি ব্যবহার করেন। নারীও যে পুরুষের মতো মানুষ, এটি পৃথিবীর যে কোনো সভ্য মানুষ সত্য বলেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস ও লালন করে কথায়-কাজে-কর্মে। রেইপ বা ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধ বাংলাদেশে ঘটেই যাচ্ছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ, ঘৃণ্য ও লোমহর্ষক। বাংলাদেশে ২০২১ সালে ‘রেইপ’ ও সংঘবদ্ধ ‘রেইপের’ শিকার হয়েছে ১ হাজার ৩২১ জন। ধর্ষণের পর ৪৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আবার এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭৭ জন পুরুষ। বাংলাদেশে ২০২১ সালে ৮ মাসে ৯৭৮ জন ধর্ষিত হয়েছে। এ দেশে শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনাও অনেক সংঘটিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত মেধাবী মেয়েরাও পাশবিকভাবে ধর্ষণের শিকার হয়।

বিশ্বে ধর্ষণের প্রথম ১০টি দেশ হলো বতসোয়ানা, অস্ট্রেলিয়া, লেসোথো, সাউথ আফ্রিকা, বারমুডা, সুইডেন, সুরিনাম, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া ও গ্রানাডা। আমেরিকার বু্যরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিসটিকস অনুযায়ী আমেরিকায় ধর্ষণের শিকার মোট সংখ্যার মধ্যে নারী ৯১ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ পুরুষ। ন্যাশনাল ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার প্রতি ছয় জন নারীর মধ্যে এক জন ধর্ষণের শিকার এবং প্রতি ১১ জন পুরুষের মধ্যে এক জন পুরুষ ধর্ষণের শিকার। এ দেশে ১৪ বছর বয়স থেকে ধর্ষণের মতো অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয় শিশু মনে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলা হয় Rape Capital of the World। সে দেশে ধর্ষণের শাস্তি মাত্র দুই বছরের কারাবাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় এক জন নারী নির্যাতনের শিকার হন। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

বিশ্বের সব দেশেই আইন রয়েছে, শাস্তিরও বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩-এর ধারা ৯ অনুযায়ী কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড, ধর্ষণের কারণে মৃত্যু ঘটলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। আবার দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের কারণে নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ঐ দলের প্রত্যেকে মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং অতিরিক্ত ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে অনধিক ১০ বছর, কিন্তু অনূ্যন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিয় হবে এবং অতিরিক্ত ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

ভারতে অপরাধ আইন (সংশোধনী) অধ্যাদেশে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত তৈরির বিধান রয়েছে। তদন্তের জন্য থানা ও সব হাসপাতালে বিশেষ ফরেনসিক কিট দেওয়া হয়। উক্ত আইন অনুযায়ী ধর্ষণ মামলার দুই মাসের মধ্যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করতে হবে। ১৬ বছরের নিচে কোনো মেয়েকে ধর্ষণ করলে কিংবা গণধর্ষণ করলে অভিযুক্তরা কোনোভাবেই আগাম জামিন পাবে না। নতুন এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১২ বছরের নিচে শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যে কোনো ধর্ষকের শাস্তি নূ্যনতম ১০ বছরের কারাদণ্ড। প্রাচীন ভারতে, গ্রিসে ও মিসরে ধর্ষণের শাস্তি ছিল পুরুষদের উপস্থচ্ছেদ বা ক্যাস্ট্রেশন (খোজা করা)। বিশ্বব্যাপী আইন রয়েছে যথেষ্ট সংখ্যায়, বিচারও রয়েছে, কিন্তু নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েই যাচ্ছে ক্রমাগত ও অহরহ।

দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশে দেখা যায়, একজন নারী ধর্ষিত হলে অনেকেই দোষ দেয় ভিকটিমকে। আরো ভয়ংকর হলো, কিছু নারীও ভিকটিমকে দোষারোপ করে। জনগণের এই অস্বাভাবিক আচরণ এ ধরনের অপরাধীদের অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে সাহাঘ্য করে। এটি আলোকিত নয়, বরং অন্ধকার মানবসমাজ সৃষ্টির লক্ষণ। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যনালে বিচারের ব্যবস্থা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। নারী ও পুরুষের লিঙ্গসমতা (জেন্ডার ইকুয়ালিটি) বাস্তবায়ন করতে হবে। জেন্ডার ইকুয়ালিটির ওপর প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষা স্তরে প্রতিটি শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক সিলেবাস প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে। শতভাগ শিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল মানবসমাজ গড়ে তুলতে আমাদের আশু ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘জেন্ডার ক্রাইম এডুকেশন’ বাধ্যতামূলক করাও জরুরি। জনসাধারণকে অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম টিভি ও গণমাধ্যমগুলোতে প্রচার করা প্রয়োজন। ইউটিউবসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল কোনো বিষয় যাতে প্রচারিত না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জরুরি। খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, সংগীত, ছবি আঁকা প্রভৃতি পারিবারিক পরিবেশ জনপ্রিয় করার ওপর জোর দিতে হবে।

আমরা সবাই জানি ও বিশ্বাস করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ দমনে এবং অপরাধীর শাস্তি প্রদানে বদ্ধপরিকর। তিনি অনেক পদক্ষেপ গ্রহণও করেছেন। জঙ্গিবাদ দমনে যেমন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করেছেন, জনগণ সরকারকে সাহাঘ্য করেছে; তেমনি নারী নির্যাতন, নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো অপরাধীই যাতে শাস্তিবিহীনভাবে পার না পায়, তার জন্য সরকার সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যকর করবে এমনটি বিবেকবান মানুষ ও সমাজ দাবি করে। তবে জনগণকে সরকারের পাশে থাকতে হবে; বুঝতে হবে সরকারের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

এখানে স্মরণ করতে হয় আধুনিক সিঙ্গাপুরের জাতির জনক প্রয়াত লি কুয়ান ইউর সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার। সাংবাদিকেরা তাকে জিগ্যেস করেছিলেন, আপনার দেশে এত কঠোর আইন কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যখন সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না, তখন সেটি করতে হয় কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। সর্বোপরি অপরাধ দমনে মূল্যবোধ শিক্ষার বাস্তবমুখী কার্যক্রমে দেরি না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে ফলপ্রসূ করা অতীব জরুরি।

লেখক: সাবেক ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন