আজ হইতে অর্ধশতাব্দী পূর্বে বিশ্বে নারীর যে দৈন্যদশা ছিল, তাহা আর নাই। আজিকার নারীরা বহু ক্ষেত্রেই অগ্রগামী। নারীর শিক্ষা, স্বাস্হ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসিয়াছে। এমনকি নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাইতে শুরু করিয়াছে। এই সকল উন্নতি ও ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই প্রশংসনীয় ও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সার্বিক বিচারে নারীর পশ্চাত্পদতা এখনো দূর হয় নাই। তৃতীয় বিশ্ব তথা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের কথা বাদই দিলাম, খোদ উন্নত ও সভ্য দেশেও এখনো নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান। অবশ্য সেই সকল সমাজে নারীর সমতার বিষয়টি স্বীকৃত। তবে মজুরিসহ বিভিন্ন বৈষম্য আজও দৃশ্যমান। আমরা নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি সকলই চাই, তবে অন্ধ অনুকরণ চাই না। শালীনতা বজায় রাখিয়া নারী ঘরে-বাহিরে সর্বত্র কাজ করিয়া যাইবে—ইহাই আমরা কামনা করি।
আজ সারা বিশ্বে যে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হইতেছে, সেই দিবসের তাত্পর্য ও গুরুত্ব রহিয়াছে। জাতিসংঘ এই দিবসটি ১৯৭৫ সাল হইতে উদ্যাপন করিলেও তাহারও বহু আগে হইতে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হইয়া আসিতেছে। ১৯০৯ হইতে ১৯১১ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড সূচিত এই দিবসটি পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীনসহ ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাপক-উত্সাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে উদ্যাপিত হয়। ইহার পিছনে রহিয়াছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালে বিদ্যমান মজুরিবৈষম্য, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রাজপথে নামিয়া আসিয়াছিলেন সুতা কারখানার অসংখ্য নারী শ্রমিক। সেই প্রতিবাদী মিছিলে চলে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ইহাতে আহত ও গ্রেফতার হইয়াছিলেন অসংখ্য নারী। ইহার পর নারীসমাজের যৌক্তিক দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করিয়া মহীয়সী জার্মান নারীনেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৯১০ সালে তাহার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাত্ এই দিবস পালনের একটি ঐতিহ্য তৈরি হইয়াছে।
উল্লেখ্য, এই বত্সরের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হইল ‘নারীর সুস্বাস্হ্য ও জাগরণ’। আমেরিকায় নারী শ্রমিকদের যেই আন্দোলনের সূত্রপাত হইয়াছিল তাহার প্রধান একটি উদ্দেশ্য ছিল নারীর কর্মক্ষেত্রে সুস্হ ও স্বাস্হ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল, তাহা আজও কাঙ্ক্ষিত হারে অর্জিত হয় নাই। এবারের প্রতিপাদ্যে তাই নারীর স্বাস্হ্য রক্ষার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। বিশেষ করিয়া, মাতৃত্ব অর্জন করিবার পর নারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহা দূরীকরণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বকে অস্বীকার করা যায় না। এদিকে নারী আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারীসমাজের যথেষ্ট অগ্রগতি হইলেও নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা এখনো বন্ধ হয় নাই। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নহে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়িয়াছে সত্য, কিন্তু এখনো তাহা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করিতেছে। নারীর বঞ্চনা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয় নাই। যৌতুক প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিভিন্ন কুসংস্কার, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি এখনো প্রতিবন্ধক স্বরূপ। জাতীয় জীবনে নারীর মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা জাতিসংঘ সিডও সনদসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক নীতি ও সনদে স্বাক্ষর করিয়াছি। তবে এগুলির বাস্তবায়নে আমাদের আরো মনোযোগ দাবি করে।
বাংলাদেশে করোনা মহামারির সময় চিকিত্সা প্রদানে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসাবে যাহারা লড়াই করিয়াছেন, তাহাদের সিংহভাগই নারী। এই নারীদের আমরা কতটা খোঁজখবর রাখিয়াছি? অনানুষ্ঠানিক খাতে যেই সকল নারীর কর্মচু্যতি ঘটিয়াছে, তাহাদের কথাও ভাবিতে হইবে এখন। শিক্ষাক্ষেত্রে নারী যে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে তাহাও আমাদের কাটাইয়া উঠিতে হইবে। পারিবারিক সহিংস আচরণ বন্ধে সকলকে হইতে হইবে সজাগ ও সচেতন। নারী ও মেয়ে শিশুদের স্বাস্হ্য ও পুষ্টির উন্নয়নেও মনোনিবেশ করিতে হইবে। নারীর প্রতি সকল রকম বৈষম্য ও অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটুক এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব গড়ার কাজে পুরুষের সমান অবদান রাখিবার প্রত্যয় নিয়া নারীর আগামীর পথচলা আরো কণ্টকমুক্ত ও বেগবান হউক, ইহাই আমরা প্রত্যাশা করি। আমরা আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের নারী সমাজকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
