মনীষীরা বলিয়া থাকেন—যুদ্ধ হইল এমন এক জায়গা, যেইখানে তরুণরা একে অপরকে হত্যা করে—যদিও তাহারা পরস্পরকে চিনে না, ঘৃণাও করে না। আর তাহারা ইহা করে কিছু যুদ্ধবাজ মানুষের সিদ্ধান্ত মানিয়া লইয়া, যাহারা পরস্পরকে চিনে এবং ঘৃণাও করে; কিন্তু হত্যা করে না। এই তো মাত্র গত শতকে এই বিশ্ব ভয়াবহ দুইটি বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়া গিয়াছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং আপামর বৈশ্বিক অভিঘাত লইয়া রচিত হইয়াছে বিপুলসংখ্যক ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক গল্প-উপন্যাস। নির্মিত হইয়াছে আমাদের মানবিক বোধকে বিবশ করা বিখ্যাত অনেক চলচ্চিত্র। এরিক মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ হইতে নির্মিত হলিউডের সিনেমার কথা এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন জার্মান সৈনিক ছিলেন এরিক মারিয়া রেমার্ক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা হইতে তিনি ১৯২৯ সালে রচনা করেন তাহার এই বিখ্যাত উপন্যাস। এই উপন্যাসের চলচ্চিত্রের শুরুতে দেখা যায়—এক অধ্যাপক জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে তাহার ছাত্রদের উৎসাহ দিতেছেন সেনাবাহিনীতে যোগদান করিবার এবং দেশের সংকটে কিছু করিবার জন্য। ফলে ছাত্ররা উৎতেজিত হইয়া সমস্ত খাতা-বই ছিঁড়িয়া সেনাবাহিনীতে নাম লিখায়; কিন্তু যুদ্ধে যাইয়া তাহারা যখন মৃতু্যর মুখোমুখি হয়, ট্রেঞ্চের ভিতরে দিনের পর দিন লুকাইয়া থাকে এবং তাহাদের মধ্যে একে একে অনেকেই মৃতু্যবরণ করে, তখন তাহারা অনুধাবন করিতে পারে, যুদ্ধের ভিতরে কোনো মানবিকতা কিংবা দেশপ্রেমের রোমান্টিকতা নাই, বরং রহিয়াছে এক প্রচণ্ড নারকীয়তা। দিনের পর দিন খাদ্য ও জলের অভাবে মৃতু্যর সহিত লড়াই করিতে করিতে তাহারা বুঝিতে পারে—তাহারা আসলে কিছু যুদ্ধবাজ শক্তিধর মানুষের হাতের পুতুল। তাহাদের ঠেলিয়া দেওয়া হইয়াছে মরিবার জন্য।
যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধ চাহিলেও এড়ানো যায় না। যুদ্ধ ছাড়া সমাধানও মিলে না। তবে কিছু কিছু যুদ্ধ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সমস্যা নহে, উহা সমগ্র বিশ্বের জন্যই পরোক্ষ সমস্যা হইয়া উঠে। প্রায় পক্ষকালব্যাপী চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ হইল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হইতে ইউরোপের সবচাইতে বড় সংঘাত ও সংকট। যেই সমস্ত বিষয় বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলিবে, তাহার মধ্যে একটি হইল খাদ্যসংকট। বিশ্বের অন্যতম এক বৃহত্ সার কোম্পানির প্রধান বলিয়াছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারের দাম লাগামছাড়া করিয়া দিতে পারে। এমনিতেই গ্যাসের মূল্য আকাশছোঁয়া হইবার কারণে রাশিয়ান আগ্রাসনের পূর্ব হইতেই সারের মূল্য বেশি ছিল। তাহা এখন কোথায় গিয়া ঠেকিবে বুঝা যাইতেছে না। এইদিকে নাইট্রোজেন সারের মূল উপাদান অ্যামোনিয়া তৈরি করিতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়। অনেক বড় বড় সংস্হা তাহাদের ইউরোপীয় প্ল্যান্টের জন্য প্রচুর পরিমাণে রাশিয়ান গ্যাসের উপর নির্ভর করিয়া থাকে। তাহা ছাড়া রাশিয়া প্রচুর পরিমাণে সারের মূল উপাদান যেমন ‘পটাশ’ এবং ‘ফসফেট’ উৎপাদন করে।
মনে রাখিতে হইবে, সারের জন্য বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা খাদ্য পাইয়া থাকে। কারণ, সারের কারণেই উৎপাদন দ্বিগুণ-তিন গুণ হইয়া থাকে। সুতরাং পর্যাপ্ত সার থাকিলে ফলন কমিয়া যাইবে। নগরে আগুন লাগিলে তাহার উৎতাপ হইতে দেবালয়ও যেমন রক্ষা পায় না, তেমনি রুশ-ইউক্রেন এই যুদ্ধের অভিঘাত আমাদের উপরও পড়িবে নিশ্চিতভাবে। যদিও বিশ্বের যেই সকল দেশের সহিত বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানি বেশি হয়, টাকার অঙ্কে সেই তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রাশিয়া বা ইউক্রেন নাই; কিন্তু দুইটি দেশের সহিতই বাংলাদেশের বাণিজ্য রহিয়াছে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই দেশে গম, সূর্যমুখী তৈল আর ভুট্টার দাম বাড়িতে শুরু করিয়াছে। তুলা, সরিষা ও মসুর ডাল রাশিয়া ও ইউক্রেন হইতে আমদানি করা হয়। তেলের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির কারণে জাহাজ ভাড়াও বাড়িতেছে। এই অবস্হায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিশেষ পরিকল্পনা ও ব্যবস্হাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাহাতে আসন্ন বিপর্যয় আমরা বুদ্ধিমত্তার সহিত সামলাইতে পারি।
